পবিত্র কোরআনের আলোকে প্রশ্নোত্তরে ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ

মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন

১. প্রশ্ন: মিলাদুন্নবী ﷺ-এর অস্তিত্ব কোথায় আছে?

উত্তর: পবিত্র কুরআনের ১১৪টি সূরার মধ্যে ৯০ নম্বর সূরা সূরা আল-বালাদ। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন—

لَا أُقْسِمُ بِهَٰذَا الْبَلَدِ

“আমি এই নগরীর শপথ করছি।”

এত শহর থাকতে আল্লাহ তায়ালা মক্কা নগরীর শপথ কেন করলেন?

এর একটি তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা হলো—এই পবিত্র নগরীতেই বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর শুভ জন্ম বা মিলাদুন্নবী ﷺ সংঘটিত হয়েছে।

অতএব, যারা বলেন মিলাদুন্নবী ﷺ-এর কোনো অস্তিত্ব নেই, তাদের বক্তব্য সঠিক নয়। তবে মনে রাখতে হবে, আয়াতের সরাসরি তাফসির ও ইশারাভিত্তিক ব্যাখ্যা এক বিষয় নয়।

২. প্রশ্ন: মিলাদুন্নবী ﷺ কোন সময়ে হয়েছে?

উত্তর: আল্লাহ তায়ালা সূরা আদ-দুহায় বলেন—

وَالضُّحَىٰ

“শপথ পূর্বাহ্নের উজ্জ্বল আলোর।”

যে সময়ে রাতের আঁধার দূর হয়ে দিনের আলো পৃথিবীকে আলোকিত করে, সেই আলোর সঙ্গে মিলাদুন্নবী ﷺ-এর আগমনের একটি সুন্দর উপমা পাওয়া যায়।

৩. প্রশ্ন: মিলাদুন্নবী ﷺ হওয়ার পর পৃথিবীর অবস্থা কেমন হয়েছে?

উত্তর: আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন—

وَاللَّيْلِ إِذَا عَسْعَسَ ۝ وَالصُّبْحِ إِذَا تَنَفَّسَ

“শপথ রাতের, যখন তা বিদায় নেয়; এবং শপথ প্রভাতের, যখন তা উদ্ভাসিত হয়।”

যেভাবে রাতের অন্ধকার দূর হয়ে প্রভাতের আলো পৃথিবীকে আলোকিত করে, তেমনিভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আগমনে অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও পাপাচারের অন্ধকার থেকে মানবজাতি হেদায়াতের আলো লাভ করেছে।

৪. প্রশ্ন: যে সময়ে মিলাদুন্নবী ﷺ হয়েছে, সেই সময়ের গুরুত্ব কেমন?

উত্তর: আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন—

وَالْعَصْرِ

“শপথ সময়ের।”

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আগমনের সময় মানবজাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতময়। কারণ তাঁর আগমনের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে সর্বশ্রেষ্ঠ হেদায়াত ও রহমতের পথ দেখিয়েছেন।

৫. প্রশ্ন: মিলাদুন্নবী ﷺ সর্বপ্রথম কে করেছেন?

উত্তর: পবিত্র কুরআনের সূরা আলে ইমরানের ৮১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নবী-রাসূলগণের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণের কথা উল্লেখ করেছেন—

وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ

অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালা নবীগণের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন যে, তাঁদের কাছে রাসূল আসলে তাঁরা তাঁর প্রতি ঈমান আনবেন এবং তাঁকে সাহায্য করবেন।

এ আয়াতকে কেন্দ্র করে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আগমন ও মর্যাদা স্মরণ করার বিষয়টি আলোচনা করা হয়।

৬. প্রশ্ন: মিলাদুন্নবী ﷺ করলে কী পাবো?

উত্তর: আল্লাহ তায়ালা সূরা ইউনুসের ৫৮ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেন—

قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَٰلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ

“বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর রহমতের কারণে তারা আনন্দিত হোক। তারা যা সঞ্চয় করে, তার চেয়ে এটিই উত্তম।”

এই আয়াতের আলোকে আল্লাহর ফজল ও রহমতের কারণে আনন্দ প্রকাশ করা বৈধ ও প্রশংসনীয়—এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ নিঃসন্দেহে আল্লাহর মহান রহমতের প্রকাশ।

৭. প্রশ্ন: কী কারণে মিলাদুন্নবী ﷺ করবো?

উত্তর: আল্লাহ তায়ালা বলেন—

بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَٰلِكَ فَلْيَفْرَحُوا

“আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর রহমতের কারণে তারা আনন্দিত হোক।”

অতএব, আল্লাহর ফজল ও রহমতের শুকরিয়া আদায় এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আগমন স্মরণ করে আনন্দ প্রকাশের উদ্দেশ্যে মিলাদ মাহফিল আয়োজন করা হয়।

৮. প্রশ্ন: আল্লাহর রহমত কী?

উত্তর: আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-আম্বিয়ার ১০৭ নম্বর আয়াতে তাঁর প্রিয় হাবীব ﷺ সম্পর্কে ইরশাদ করেন—

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ

“আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।”

সুতরাং রাসূলুল্লাহ ﷺ হলেন রহমাতুল্লিল আলামিন—সমগ্র জগতের জন্য আল্লাহর রহমত।

৯. প্রশ্ন: নিয়ামত পাওয়ার পর ঈদ বা আনন্দ প্রকাশ করার কোনো প্রমাণ কুরআনে আছে?

উত্তর: সূরা আল-মায়িদার ১১৪ নম্বর আয়াতে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের হাওয়ারীগণ দোয়া করেছিলেন—

رَبَّنَا أَنْزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِيدًا لِّأَوَّلِنَا وَآخِرِنَا

“হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আকাশ থেকে একটি খাদ্যভর্তি দস্তরখান নাযিল করুন, যা আমাদের প্রথম ও পরবর্তী সকলের জন্য ঈদের বিষয় হবে।”

এখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ নিয়ামত লাভের পর সেটিকে আনন্দ ও স্মরণের উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

১০. প্রশ্ন: কেউ যদি মিলাদুন্নবী ﷺ-এর বিরোধিতা করে, তাহলে আমাদের করণীয় কী?

উত্তর: আমাদের করণীয় হলো—বিরোধিতার জবাব বিরোধিতা দিয়ে নয়; বরং কুরআন-সুন্নাহ, আদব, হিকমত ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে দেওয়া।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন—

يُرِيدُونَ لِيُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَاللَّهُ مُتِمُّ نُورِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ

“তারা তাদের মুখের ফুঁ দিয়ে আল্লাহর নূর নিভিয়ে দিতে চায়; কিন্তু কাফিররা অপছন্দ করলেও আল্লাহ তাঁর নূর পূর্ণ করবেন।”

অতএব, আমাদের দায়িত্ব হলো—রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা, দরুদ-সালাম, সীরাত আলোচনা, তাঁর আদর্শ অনুসরণ এবং উত্তম আখলাকের মাধ্যমে তাঁর স্মরণকে জীবন্ত রাখা।

১১. প্রশ্ন: কেউ যদি মিলাদুন্নবী ﷺ বন্ধ করতে চায়, তাহলে কি তা বন্ধ করতে পারবে?

উত্তর: না, কেউ মিলাদুন্নবী ﷺ-এর আলোচনা, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর গুণগান ও তাঁর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ বন্ধ করতে পারবে না। কারণ আল্লাহ তায়ালা তাঁর নূরকে পূর্ণ করার ঘোষণা দিয়েছেন।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন—

يُرِيدُونَ لِيُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَاللَّهُ مُتِمُّ نُورِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ

“তারা তাদের মুখের ফুঁ দিয়ে আল্লাহর নূর নিভিয়ে দিতে চায়; কিন্তু কাফিররা অপছন্দ করলেও আল্লাহ তাঁর নূর পূর্ণ করবেন।”

অতএব, কেউ যতই বাধা দেওয়ার চেষ্টা করুক, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মহব্বত, তাঁর মিলাদের আলোচনা এবং তাঁর প্রতি দরুদ-সালাম কিয়ামত পর্যন্ত মুমিনদের হৃদয়ে জাগ্রত থাকবে।