পাক পাঞ্জাতন পরিচিত ও মর্যাদা

 মাওলানা মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন কাদেরী

পাক পাঞ্জাতন পারসি শব্দ,এটির বাংলা অনুবাদ হল, পাঁচ পবিত্র ব্যক্তি তথা পাঁচ পবিত্র আত্মা। পাক পাঞ্জাতন হলেন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু, হযরত ফাতিমা রাঃ, হযরত হাসান রাঃ, হযরত হুসাইন রাঃ। এই পাঁচ জন হলেন পাক পাঞ্জাতন।
কুরআনুল কারীম ও হাদিস শরীফে এর পরিচিতি ও ফজিলত রয়েছে
পবিত্র আত্মা তথা পাক পাঞ্জাতন সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন إِنَّمَا يُرِيدُ اللهِ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُظْهِرَ كُمْ تَطْهِيرًا . অর্থাৎ ওগো নবীর বংশধর। আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা হল যে, তোমাদের থেকে প্রত্যেক ধরনের অপবিত্রতা দূরীভূত করবেন এবং তোমাদেরকে সর্বদিক দিয়ে পুতঃপবিত্র রাখবেন। সূরা আহযাব, আয়াত-৩৩

এই আয়াতে আহলে বাইতের পবিত্রতার কথা ঘোষণা করা হয়েছে, মুফাস্সির বলেন এই আয়াতে হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহার কথা বলা হয়েছে( তিরমিজি ৩৭৮৭)

এই আয়াত যখন অবতীর্ণ হল ,নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহলে বাইতকে চাদরের নিচে টেনে নিয়েছেন
‎ عَنْ عُمَرَ بْنِ أَبِي سَلَمَةَ، رَبِيبِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ لَمَّا نَزَلَتْ هَذِهِ الآيَةُ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلمَّ ‏:‏ ‏(‏ إنمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا ‏)‏ فِي بَيْتِ أُمِّ سَلَمَةَ فَدَعَا فَاطِمَةَ وَحَسَنًا وَحُسَيْنًا فَجَلَّلَهُمْ بِكِسَاءٍ وَعَلِيٌّ خَلْفَ ظَهْرِهِ فَجَلَّلَهُمْ بِكِسَاءٍ ثُمَّ قَالَ ‏”‏ اللَّهُمَّ هَؤُلاَءِ أَهْلُ بَيْتِي فَأَذْهِبْ عَنْهُمُ الرِّجْسَ وَطَهِّرْهُمْ تَطْهِيرًا ‏”‏ ‏.‏ قَالَتْ أُمُّ سَلَمَةَ وَأَنَا مَعَهُمْ يَا نَبِيَّ اللَّهِ قَالَ ‏”‏ أَنْتِ عَلَى مَكَانِكِ وَأَنْتِ عَلَى خَيْرٍ ‏”‏

হযরত উমার ইবনু আবি সালামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
যিনি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর আশ্রয়ে লালিত-পালিত হন। তিনি বলেন, উম্মু সালামাহ (রাঃ) এর ঘরে রাসুল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হল (অনুবাদ) “আল্লাহ তা’আলা তো চান আহ্লে বাইত হতে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদের কে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে”– (সূরা আহযাবঃ ৩৩), তখন তিনি ফাতিমাহ, হাসান ও হুসাইন (রাঃ) কে ডাকলেন এবং তাদেরকে একটি কম্বলের ভিতর ঢেকে নিলেন। আলি (রাঃ) তাঁর পেছনে ছিলেন। তিনি তাকেও কম্বলের ভিতরে নিয়ে নিলেন। তারপর তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! এরা আমার ‘আহলে বাইত’ (পরিবার সদস্য)। তুমি তাদের ভিতর হতে অপরিছন্নতা দূর করে দাও এবং সম্পূর্ণরূপে পরিচ্ছন্ন করে দাও”। উম্মু সালামাহ (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর নবী! আমিও কি তাদের অন্তর্ভুক্ত? তিনি বললেনঃ তুমি স্ব-স্থানে থাক এবং তুমি কল্যাণের মধ্যেই আছ।

জামে’ আত-তিরমিজি, হাদিস নং ৩২০৫

পাক পাঞ্জাতনের পরিচয় সম্পর্কে কোরআনুল কারীমের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন
نَدْعُ أَبْنَاءَنَا وَأَبْنَاءَكُمْ وَنِسَاءَنَا وَنِسَاءَكُمْ وَأَنفُسَنَا وَأَنفُسَكُمْ ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَل لَّعْنَتَ اللهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ
অতঃপর আপনার নিকট জ্ঞান আসার পর যে কেউ এ বিষয়ে আপনার সাথে তর্ক করে তাকে বলুন, এস, আমরা আহ্বান করি আমাদের পুত্রদেরকে ও তোমাদের পুত্রদেরকে, আমাদের নারীদেরকে ও তোমাদের নারীদেরকে, আমাদের আমাদের নিজেদেরকে ও তোমাদের নিজেদেরকে, তারপর আমরা মুবাহালা (বিনীত প্রার্থনা) করি, অতঃপর মিথ্যাবাদীদের উপর দেই আল্লাহর লা’নত।
সূরা আল ইমরান আয়াত নং ৬১

এই আয়াতে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম হযরত মা ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ইমাম হাসান ইমাম হোসেন রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এদেরকে বুঝানো হয়েছে

অত্র আয়াত এবং হাদীসে পাক পাঞ্জাতন সম্পর্কে তাঁদের পরিচয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট হয়ে গেল। কোরআন এবং হাদীসে নির্দিষ্টভাবে তাঁদের পরিচয় ও ফজিলত থাকার পরেও তাদেরকে যারা অস্বীকার করেন, তারা মূলত কোরআন ও হাদিস অস্বীকার করেন।

পাক পাঞ্জাতন বলার বৈধতাঃ
পাক পাঞ্জাতন অর্থ পাঁচজন পবিত্র ব্যক্তিত্ব। ইহা দ্বারা নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), হযরত আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু), হযরত ফাতেমা বতুল (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা), হযরত ইমাম হাসান (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) ও হযরত ইমাম হোসাইন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) কে বুঝানো হয়।এই পাক পাঞ্জাতন বলার বৈধতায় অনেকেই কলম ধরেছেন কিতাব লিখেছেন, তার মধ্যে জামিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়াস ফকিহ আল্লামা মুফতি কাজী আব্দুল ওয়াজেদ সাহেব ও বিশিষ্ট কলম সম্রাট আল্লামা ফয়েজ আহমদ ওআইসি ভাওয়ালপুর পাকিস্তান এর স্বতন্ত্র ফতোয়ার কিতাব রয়েছে। এই কিতাবের নাম “পাঞ্জাতন পাক কেহনে কা ছবুত” ।

কোরআন হাদিসের আলোকে পাক পাঞ্জাতন বলা বৈধ। আমরা সহজে বলতে পারি পাক পাঞ্জাতন অস্বীকার করার অর্থ হলো কুরআনের আয়াত ও হাদীস অস্বীকার করা, যারা কুরআনের একটি আয়াত মানেন আরেকটি আয়াত মানেন না, তাদের সম্পর্কে আল্লাহতালা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ,আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন
اَفَتُؤۡمِنُوۡنَ بِبَعۡضِ الۡكِتٰبِ وَ تَكۡفُرُوۡنَ بِبَعۡضٍ ۚ فَمَا جَزَآءُ مَنۡ یَّفۡعَلُ ذٰلِكَ مِنۡكُمۡ اِلَّا خِزۡیٌ فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ۚ وَ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ یُرَدُّوۡنَ اِلٰۤی اَشَدِّ الۡعَذَابِ ؕ وَ مَا اللّٰهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعۡمَلُوۡنَ
তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে ঈমান রাখ আর কিছু অংশ অস্বীকার কর? সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা তা করে দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ছাড়া তাদের কী প্রতিদান হতে পারে? আর কিয়ামতের দিনে তাদেরকে কঠিনতম আযাবে নিক্ষেপ করা হবে। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন
সূরা বাকারা আয়াত নং ৮৫

প্রিয় নবীর নাম মোবারক ও পাক পাঞ্জাতনের নামের বরকত হাসিলের বিশেষ নির্দেশ ও আমলঃ
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও পাক পাঞ্জাতনের নাম নিয়ে উসিলা নিয়ে দোয়া করলে দোয়া কবুল হয়

عن ابن حضرة عباس رضى الله تعالى عنه انه لـما توفى سيدنا حضرة عبد الله عليه السلام قالت الـملائكة يا الـهنا و يا سيدنا بقى نبيك يتيما وفى رواية صار نبيك فبقى من غير حافظ و مرب فقال الله! انا له حافظ و نصير و فى رواية انا وليه و حافظه و حاميه و ربه و عونه و رازقه و كافيه فصلوا عليه وتبركوا باسـمه

অর্থ: হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন- নবীর বাবার যখন ইন্তেকাল হলো ফেরেশতা বললেন, ইয়া বারে ইলাহী! আপনার প্রিয়তম হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! তিনি এখন এমন ইয়াতীম হয়ে গেলেন! উনার তো আর কোনো রক্ষনাবেক্ষণকারী এবং দেখা-শুনা তথা লালন-পালনকারী আর কেউ বাকী থাকলেন না! এ জবাবে স্বয়ং মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করেন, হে ফেরেশতা সাক্ষী থাকুন- আমিই উনার পরম অভিভাবক, আমিই উনার পবিত্রতম হিফাযতকারী, আমি উনার হাযত মুবারক পুরণকারী তথা আমিই উনার পবিত্রতম রক্ষনাবেক্ষকারী, আমিই উনার পবিত্রতম রব তায়ালা তথা লালন-পালনকারী, আমিই উনার পবিত্রতম সাহায্যকারী, আমিই উনার পবিত্রতম রিযিকদাতা এবং সার্বিক বিষয়ে আমিই উনার জন্য যথেষ্ট। সুবহানাল্লাহ!
কাজেই হে ফেরেশতা আপনারা সকলেই আমার প্রিয়তম হাবীব, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উপর দরূদ শরীফ পাঠ করুন এবং উনার পবিত্র নাম মুবারক উনার যিকির করে সীমাহীন বরকত মুবারক হাছিল করুন। সুবহানাল্লাহ!
(শারহুয যারকানী ১ম খ- ২০৭ পৃষ্ঠা)

এভাবে নবীজির নাম মোবারক ও পাক পাঞ্জাতনের নাম মোবারকের ওসিলায় আল্লাহতালা বরকত নাযিল করেন।
কোন এলাকায় বসন্ত মহামারি দেখা দিলে পাক পাঞ্জাতন তথা হুজুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), হযরত আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু), হযরত খাতুনে জান্নাত ফাতেমা যাহরা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা), হযরত ইমাম হাসান (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) ও ইমাম হোসাইন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) এর নাম মোবারক কাপড়ে অথবা কাগজে লিখে এলাকার চতুর্পাশ্বে আজান দিয়ে ঐ কাপড়-কাগজ পতাকার ন্যায় গেড়ে দিলে ঐ এলাকাতে কলেরা মহামারি চলে যায় এবং এটা পরিক্ষিত। পূর্ব যুগ হতে বুযুর্গানে দ্বীনের মাধ্যমে এই আমল প্রচলিত হয়ে আসছে।
কারো বাড়ী বা ঘরে কোন জ্বীন-পরীর বদ আছর থাকলে ঘরের দরজা সমূহের উপরে পাক পাঞ্জাতনের নাম লাগিয়ে দিলে নামের বরকতে উহা দূরিভূত হয়ে যায়।

নিম্নে তার নমুনা দেওয়া হল-

لى خمسة اطفى بها : حر الوباء الحاطمة

المصطفى والمرتضى : وابنا هما والفاطمة

অর্থঃ আমার সহায় আছেন পাঁচজন তাদের দয়ায় আমি নিভাই মহামারীর দাব দাহ। (তাঁরা) মুস্তফা, মুরতদা ও তাঁদের দুশাহজাদা হযরত ইমাম হাসান ইমাম হোসাইন ও আর ফাতেমা আলাইহিমাস সালাম।

পাক পাঞ্জাতনের নামে ফাতিহা ও তাবাররুকের আয়োজন করা
আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারীমের মধ্যে এরশাদ করেন

وَالَّذِينَ جَاءُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ
অর্থ: আর যারা তাদের পরে আগমন করেছে, তারা বলে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং আমাদের সেই ভাইদেরকে ক্ষমা করুন যারা আমাদের পূর্বে ঈমান এনেছে। আর মুমিনদের প্রতি আমাদের অন্তরে যেন কোনো হিংসা না থাকে। হে আমাদের প্রতিপালক! নিশ্চয় আপনি বড়ই দয়ালু, অতি করুণাময়।’
এই আয়াতের মধ্যে ইসালে সওয়াব ও ফাতেহা করার নির্দেশনা রয়েছে
সূরা হাশর আয়াত ১০

কোন কিছু শিরনী, হালুয়া, মিঠাই, সামান্যতম যা যোগাড় করা সম্ভব অত্যন্ত পাক সাফ পবিত্র অবস্থায় নিবেদন করা। দুই রাকাত নফল নামাজ পাঁচবার সূরা ইখলাস (ঐচ্ছিক) দিয়ে পড়ে পাক পাঞ্জাতনের রুহের সব বকশিশ দিবেন।

ফাতেহার পদ্ধতি

১) এস্তেগফারঃ ১১বার।

২) ইসমে আযম শরীফঃ ১১বার

৩) ইসমে আযম শরীফঃ ইয়া শায়খ আবদুল কাদির জিলানী শাই আন লিল্লাহঃ১১বার।

৪) সুরা কাফেরুনঃ ৩বার

৫) সূরা এখলাসঃ ৩বার

৬) সুরা ফালাকঃ ৩বার

৭) সুরা নাসঃ ৩বার

৮) সূরা ফাতেহাঃ৩বার

৯) ইসমে আযম শরীফঃ১১বার

১০) দরূদ শরীফঃ১১বার

সর্বশেষ মোনাজাত করবে নিজের হাজত গুলো আল্লাহতালার কাছে বিনয়ের সহিত উপস্থাপন করবে।