বিষয়: ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর শাহাদাত বা আত্মত্যাগে ইসলামি আকিদা বা বিশ্বাস- তার স্ব-মহিমায় প্রাণ ফিরে পায়।

সৈয়দ মোহাম্মদ শরফুদ্দীন সম্রাট (মাঃজিঃআঃ)

প্রারম্ভিকা: ‘ইসলাম’ শব্দটি শাব্দিক অর্থের আঙ্গিকে ‘শান্তির পয়গাম বা বার্তা বহনকারী।’অর্থাৎ,ইসলাম মানেই শান্তি।আর ইসলামী পথ শান্তির পথ।যার আহবান সৃষ্টির সূচনালগ্ন হতেই শান্তির ও সমৃদ্ধির এবং সম্প্রীতির।আবে।র ইসলামের অন্তর্নিহিত অর্থ হলো-আত্মত্যাগ।অর্থাৎ,নিজের প্রাণ,ক্বলব ও অন্তরকে পাশাপাশি নিজের আপাদমস্তক (মাথা হতে পা পর্যন্ত) আল্লাহর রাস্তায় কুরবানী বা উৎসর্গ করা।

যিনি উৎসর্গ করেন বা করতে সফল হন,তাকেই মুসলিম বা আত্মসমর্পণকারী বলা হয়।তাই ইসলাম সমস্ত মুসলমানের আমানতস্বরূপ।আরো সহজভাবে বলতে গেলে,ইসলামী আকিদা বা বিশ্বাসের মৌলিক বিষয়গুলোর প্রতি যথাযথ বিশ্বাস,সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন এবং সেগুলোকে আঁকড়ে ধরে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন।ইসলামী আকিদার মৌলিক বিষয়গুলো হলো-আল্লাহ,ফেরেশতা,কিতাব,রাসূল,আখিরাত এবং তাকদীরে বিশ্বাস।এই ছয়টি বিষয়কে ঈমানের স্তম্ভ বলা হয়।যে বা যারা এই বিষয়গুলোর প্রতি যথোপযুক্ত আদব বা সম্মান প্রদর্শন করবে,এক কথায় এই বিষয়গুলোকে অন্তরে লালন করবে এবং পালন করবে,তারা আল্লাহর দরবারে প্রকৃত মুসলমান বা ঈমানী মুসলমান হিসেবে পরিগণিত হবে।ঈমানী মুসলমান হওয়ার জন্য বা মুমিন ও মুত্তাকী হতে হলে,এমন কোনো জাত (মহান হাস্তী) বআ মহান ব্যক্তিত্ত্বের অনুসরণ করা উচিত,যাঁর অনুসৃত পথ অনুসরণ করে ঈমানী মুসলমান বা প্রকৃত মুমিন হওয়া যায়।

আর যাঁকে অনুসরণ করা হবে,তাঁর মাঝে তাকওয়া (খোদাভীতি),নবী করিম (সাঃ) এর প্রতি পূর্ণ ভালোবাসা,আদব,আহলে বায়েতে রাসূলগণ,সাহাবীগণ এবং আউলিয়া কেরামগণের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও বিশ্বাস,ইবাদত,রেয়াযত,মুরাকাবা,মুশাহাদাহ সহ ইত্যাদি বিষয়াবলি বিদ্যমান থাকতে হবে।

উপরিউক্ত বিষয়াবলি যে ব্যক্তির মাঝে আছে,তা অন্বেষণ করতে বা তাকে খুঁজে নিতে উম্মতে মুহাম্মদী (সাঃ) এর কষ্ট না হয়,তাই আল্লাহ তায়ালা শেষ জমানায় উম্মতের জন্য বা উম্মতে মোহাম্মদী (সা:) এর জন্য ইমাম হোসেইন (রাঃ) কে আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ) প্রদত্ত নিয়ামত হিসেবে আমাদের দান করেছেন।সুতরাং প্রকৃত মুমিন ও মুত্তাকী হওয়ার জন্য এবং প্রকৃত মুসলমান হওয়ার জন্য ইমাম হোসেইন (রাঃ) এর অনুসরণ ও হুসাইনী সৈনিক হওয়া ঈমানী দাবী ও ঈমানের দাবী।ইমাম হোসেইন (রাঃ) এর রশিকে ধরে বা তাঁকে অনুসরণের মাধ্যমে আল্লাহ ও রাসূলে পাক (সাঃ) এর নৈকট্য অর্জন করাই ইসলামী আকিদার মূলমন্ত্র।

নিম্নে ইসলামী আকিদার মৌলিক বিষয়ের আলোকে ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর অবদান ও আত্মত্যাগ সম্পর্কে আলোচিত হলো-

• আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস (তাওহীদ)➤ কারবালার ৬১ হিজরির করুণ কাহিনী আমাদের জানিয়ে দেয়,আল্লাহর রাস্তায় ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর আত্মত্যাগ কেমন ছিল!উনার প্রতিটি মুহুর্ত ছিল আল্লাহর উপর পূর্ণ বিশ্বাস এবং মস্তক অবনতি।

দ্বারে রাহমানে (আল্লাহর দরজায়) মস্তক অবনত করে,সিজদা আরয করে যিনি নিজের মাথাকে বিলিয়ে দিলেন,তিনিই আমাদের ইমাম (রাঃ)।একটি বিষয় গভীরভাবে লক্ষ্য করলে বুঝা যাবে যে,ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর শাহাদাত মূল বিষয় ছিল কিন্তু তাওহীদ।

আর তাওহীদ পর্যন্ত পৌঁছার মূল মাধ্যম হলো রিসালত (রাসূলে পাক সাঃ এর প্রতি আদব,প্রেম,ভালোবাসা,পূর্ণ আনুগত্য)।যে ধারা অন্তরে ধারণ করে,কারবালার ধু ধু প্রান্তরে রাওয়ানা দিয়েছিলেন ইমাম হুসাইন (রাঃ)।উনার বিপক্ষে যে ছিল,তার নাম ছিল ‘ইয়াজিদ।’সে ও নিজেকে তাওহীদ পন্থী বা আল্লাহর অনুগত বান্দা হিসেবে প্রমাণ করতে চেয়েছিল!তার ঝোলিতে সব ছিল।শুরুতে নামাজ,কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি।কিন্তু এক পর্যায়ে সে এসব কিছুকে বাদ দিয়ে পাপাচারে লিপ্ত হয়েছিল।মদ,জুয়া,ব্যভিচার ইত্যাদি অপকর্মে লিপ্ত হয়ে গিয়েছিল!এরপরেও যুদ্ধের ময়দানে সে নিজেকে তাওহীদ পন্থী দাবী করেছিল।তা সত্ত্বেও সে রাসূলে পাক (সাঃ) এর কলিজার টুকরা,প্রিয় নাতিজান এর দেহ মোবারক হতে মাথা মোবারক পৃথক করতে দ্বিধাবোধ করলো না!এটা কেন হলো?কারণ তার কাছে সব থাকলেও ছিল না আদবে রাসূলে পাক (সাঃ),মুহাব্বতে রাসূল (সাঃ),মুহাব্বতে আহলে বাইতে রাসূল (সাঃ),আদবে সাহাবায়ে কেরাম (নাউজুবিল্লাহ!)

পক্ষান্তরে ইমাম হুসাইন (রাঃ) তিনিও ছিলেন তাওহীদ পন্থী এবং উনার ঝোলিতে ছিল আদবে ও মুহাব্বতে রাসূল (সাঃ)।মুহাব্বতে আহলে বাইত,মুহাব্বতে সাহাবায়ে রাসূল (সাঃ)।ফলস্বরূপ আল্লাহ পাক ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর শাহাদাতকে কবুল করলেন,এর মধ্য দিয়ে উনাকে চিরস্থায়ী বিজয় দান করলেন।অতঃপর ইয়াজিদকে লাঞ্চিত,অপমানিত।চিরস্থায়ী জাহান্নামের অধিবাসী করলেন।(নাউজুবিল্লাহ!)

সুতরাং হুসাইনী তাওহীদ এর মানদন্ড ছিল,রাসূলে পাকের প্রতি আদব ও মুহাব্বত।অন্যদিকে,ইয়াজিদি তাওহীদের মানদণ্ড ছিল গোস্তাখী (বা রাসূলে পাক সাঃ এর শানে বেয়াদবী,নাউজুবিল্লাহ!)

তাই হুসাইন (রাঃ) এর অনুসরণেই প্রকৃত তাওহীদের অনুসরণ।এর বিপরীত পথে তাওহীদের অন্বেষণ করলে,তাওহীদের ব্যাখ্যা ও প্রকৃতি আল্লাহর দরবারে গৃহীত নয়।

যেহেতু আল্লাহ পাক ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর পক্ষে বিজয় দান করেছেন,উনাকে জান্নাতে যুবকদের সর্দার এর মর্যাদা দিয়ে ভরপুর করেছেন,তাই উনার পথই তাওহীদের পথও জান্নাতের পথ।(সুবহানাল্লাহ!)

• ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস ➤ ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর বিশ্বাসের দরজা সর্বক্ষেত্রে অতি উচ্চ ও প্রতিষ্ঠিত ছিল।তিনি ফেরেশতাদের প্রতি অগাধ বিশ্বাস রেখেছেন।ফেরেশতাগণও ইমাম হুসাইন (রাঃ) কে যথাযথ মর্যাদা এবং শান ও শাওকাতকে বুলন্দ করেছেন।এমনকি কারবালার জমিনে উনার শাহাদাতের সংবাদও ফেরেশতাকুল সর্দার হযরত জীব্রাইল (আঃ) দিয়েছিলেন।(আল্লাহু আকবার)।

যেমনটি হাদীস শরীফে এসেছে-

۹/٢۸ – عن عبد الله بن وهب بن زمعَة قال: أخبرَتْني أُمُّ سَلَمةَ رضي

الله عنها: أنَّ رسولَ الله ﷺ اضطجعَ ذاتَ ليلةٍ للنَّوم، فاستيقظَ وهو حائرٌ، ثم اضطجعَ فرقدَ، ثم استيقظَ، وهو حائرٌ دونَ ما رأيتُ به المرةَ الأولى، ثم اضطجعَ، ثم استيقظَ، فاستيقظتُ، وفي يده تُرْبَةٌ حمراءُ يُقَلِّبُها، فقلتُ: ما هذه التُّرْبةُ، يا رسولَ الله؟ قالَ: أخبرني جِبْريلُ أنَّ هذا يُقْتَلُ بأرضِ العراق، للحُسَيْنِ، فقلتُ لجِبْريلَ: أرِني تُرْبَةَ الأرضِ التي يُقْتَلُ بها، فهذه تُرْبَتُها.

 

 

অনুবাদ: ৯/২৮ – আবদুল্লাহ ইবনু ওহাব ইবনু জামআহ্‌ বলেন: আমাকে উম্মু সালামা (রাদি’আল্লাহু عنها) জানিয়েছেন-তিনি বলেন: এক রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘুমানোর জন্য শুয়ে পড়লেন। এরপর তিনি জেগে উঠলেন এবং তাঁকে চিন্তিত অবস্থায় দেখা গেল। এরপর তিনি আবার শুয়ে পড়লেন এবং ঘুমিয়ে গেলেন, তারপর আবার জেগে উঠলেন এবারও তিনি চিন্তিত ছিলেন, তবে প্রথমবারের তুলনায় কিছুটা কম। তারপর তিনি আবার শুয়ে পড়লেন এবং আবার জেগে উঠলেন। তখন আমিও জেগে উঠলাম। দেখি, তাঁর হাতে লালচে রঙের এক মাটি রয়েছে, তিনি তা উল্টে-পাল্টে দেখছেন( তাতে চুমা দিচ্ছিলেন)।আমি জিজ্ঞেস করলাম, “হে আল্লাহর রাসূল! এই মাটির টুকরোটি কী?” তিনি বললেন, “জিবরীল (আঃ) আমাকে জানিয়েছে, এ মাটিতে হুসাইন (রা.)-কে হত্যা করা হবে ইরাকের কোনো ভূমিতে।”

আমি তখন জিবরীলকে বললাম, “তুমি তো বলছ, এ ভূমিতে তাকে হত্যা করা হবে তাহলে আমাকে সে মাটির টুকরো দেখাও।”

তখন এই মাটি তিনি আমাকে দেখালেন। [1]

 

উল্লেখ্য: এই হাদীসটি ইমাম আহমদ ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ বর্ণনা করেছেন।এটি হুসাইন (রা:) এর শাহাদাত এবং কারবালার ভূমির প্রতি ইশারা করে।

 

আলোচ্য হাদীস শরীফ আমাদের মাঝে এই বার্তা দেয় যে,হযরত জীব্রাঈল (আঃ) সহ সমস্ত ফেরেশতাগণ হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) কে অগাধ ভালোবাসতেন এবং উনার প্রতি সম্মান ও আনুগত্য প্রদর্শন করেছেন।এর প্রমাণ হিসেবে আমরা বলতে পারি যে,এটি আমাদের পূর্ণ বিশ্বাস এবং ঈমানের দাবী।সেটি হলো,৬১ হিজরিতে কারবালার জমিনে ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর পক্ষে অসংখ্য,অগণিত ফেরেশতা ময়দানে ছিল এবং উনার শাহাদাতে সমস্ত ফেরেশতাকুল অশ্রুসিক্ত হয়েছিল।

 

• কিতাবের প্রতি বিশ্বাস ➤ আল্লাহ যুগে যুগে বিভিন্ন নবীর কাছে কিতাব নাজিল করেছেন।যেমন: তাওরাত,জাবুর,ইঞ্জিল ও কুরআন।কুরআন এর মধ্যে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব যেখানে ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর মহান মর্যাদা এবং শ্রেষ্ঠত্বকে তুলে ধরা হয়েছে।

 

اِنَّمَا یُرِیۡدُ اللّٰہُ لِیُذۡہِبَ عَنۡکُمُ الرِّجۡسَ اَہۡلَ الۡبَیۡتِ وَ یُطَہِّرَکُمۡ تَطۡہِیۡرًا ﴿ۚ۳۳﴾

 

অর্থাৎ,”হে নবীর পরিবার! আল্লাহ শুধু চান তোমাদের হতে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণ রূপে পবিত্র করতে।” [2]

 

 

উপরিউক্ত আয়াতে করিমা দ্বারা আল্লাহ পাক আহলে বাইতে রাসূল (সাঃ) গণকে বিশেষ করে ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন।ঠিক একইভাবে ইমাম হুসাইন (রাঃ) পবিত্র কুরআন মাজীদের প্রতি অপরিসীম বিশ্বাস,সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।উনার বিশ্বাসের জায়গায় পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহের প্রতিও ভরপুর ছিল।(আলহামদুলিল্লাহ!)

 

• নবী-রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস ➤ আল্লাহ পাক যুগে যুগে অসংখ্য নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন।যাদের মধ্যে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ হলেন, রাসূলে আযম হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)।উনাদের সকলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।নবী-রাসূলগণের প্রতি কেমন বিশ্বাস রাখতে হয়!সেটিও ইমাম হুসাইন (রাঃ) হতে শিখতে হবে।

কারবালার জমীনে পাপীষ্ঠ সিমার এর জঘন্য ও ভয়াবহ চেহারার বিশ্লেষণ দিয়েছিলেন।যা উনার নানাজান নবী করিম (সাঃ) ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন।যে কথার উপর বিশ্বাস রেখে ইমাম হুসাইন (রাঃ) পাপীষ্ঠ সিমার এর ভয়াবহ চেহারার বর্ণনা এভাবে দিয়েছিলেন।যা হাদীস শরীফে আলোচিত হয়েছে-

 

٣٢/٥١. عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَمْرِو بْنِ حَسَنٍ رضي الله عنه قَالَ: كُنَّا مَعَ الْحُسَيْنِ بِنَهْرَي كَرْبَلاءَ فَنَظَرَ إِلَى شَمِرِ بْنِ ذِي الْجَوْشَنِ، فَقَالَ: صَدَقَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ ﷺ، قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: كَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَى كَلبٍ أَبْقَعَ يَلَغُ فِي دِمَاءِ أَهْلِ بَيْتِي، فَكَانَ شَمِرٌ أَبْرَصَ.

 

অনুবাদ: ৩২/৫১. মুহাম্মদ ইবনু ‘আমর ইবনু হাসান (রাদি’আল্লাহু عنه) বর্ণনা করেন:

 

আমরা কারবালার নদীতীরে হুসাইন (রাযি.)-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি শিমার ইবনু যিল-জাওশান-এর দিকে তাকিয়ে বললেন:

“আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ সত্য বলেছেন।”

 

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“আমার মনে হচ্ছে, আমি একটি সাদা-কালো দাগওয়ালা কুকুরকে দেখতে পাচ্ছি, যে আমার আহলে বায়তের রক্তে জিহ্বা ডুবাচ্ছে।”

 

(হাদীস বর্ণনাকারী বলেন): শিমর ছিল কুষ্ঠরোগগ্রস্ত (অর্থাৎ তার গায়ে সাদা দাগ ছিল)। [3]

 

ব্যাখ্যা: এই হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ পূর্বেই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তাঁর পরিবারের (আহলে বাইত) উপর একদিন এমন ব্যক্তি আক্রমণ করবে যার বাহ্যিক লক্ষণ হবে একটি সাদা-কালো দাগওয়ালা কুকুরের মতো—এ ভবিষ্যদ্বাণী কারবালার ঘটনার সময় শিমরের উপর সত্য প্রমাণিত হয়।

 

• আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস ➤ মৃত্যুর পর পুনরুত্থান,বিচার,জান্নাত-জাহান্নাম ইত্যাদি আকিদার অবিচ্ছেদ্য অংশ।দুনিয়ার বুকে আল্লাহর এমন কিছু মাকবুল বান্দা আছেন,যাদের জন্য অপেক্ষায় থাকে কবর,হাশর,জান্নাত।বিশেষভাবে,উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য আল্লাহ পাক জান্নাতের বাগান সাজিয়েছেন এবং এই বাগানের সর্দার তথা যুবকদের জন্য সর্দার হিসেবে নিযুক্ত করলেন ইমাম হুসাইন (রাঃ) কে।তিনি তো জান্নাতে যুবকদের সর্দার তা সত্ত্বেও তিনি আখিরাতের প্রপ্তি দৃঢ় বিশ্বাস রেখে আল্লাহ তায়ালার এই দ্বীনের মর্যাদা রক্ষার্থে ও নবিজী (সাঃ) এর ইজ্জতের খাতিরে ৬১ হিজরিতে কারবালার জমিনে নিজেকে কুরবানী করে দিলেন!(সুবহানাল্লাহ)

 

 

• তাকদীরের প্রতি বিশ্বাস ➤ ভালো-মন্দ যা কিছু হচ্ছে বা হবে,সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়ে থাকে।তাকদীর বা ভাগ্যের ভালো-মন্দে বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।যেখানে ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর বিশ্বাস ছিল সকল সন্দেহের উর্ধ্বে।তিনি কারবালার জমিনে এক নিখুঁত সত্যের মুখোমুখি হতে নবী করিম (সাঃ) এর পাগড়ি মোবারক পড়ে,মা ফাতেমা (রাঃ) এর চাদর মোবারক কোমড় মোবারকে বেঁধে,মাওলা আলী শেরে খোদা (রাঃ) এর তলোয়ার মোবারক হাতে নিয়ে রওয়ানা দিয়েছিলেন।

সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে,রাসূলে পাক (সাঃ) এর মর্যাদাকে সমুন্নত করতে,তাকদীরের প্রতি অগাধ বিশ্বাস রেখে শাহাদাতের রাস্তাকে বেছে নিয়েছিলেন।এই মুসিবতগুলো আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে রহমত।যেমনটি পবিত্র কুরআনে এসেছে-

 

مَاۤ اَصَابَ مِنۡ مُّصِیۡبَۃٍ اِلَّا بِاِذۡنِ اللّٰہِ ؕ وَ مَنۡ یُّؤۡمِنۡۢ بِاللّٰہِ یَہۡدِ قَلۡبَہٗ ؕ وَ اللّٰہُ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمٌ ﴿۱۱﴾

 

অর্থাৎ,আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে কোন বিপদই আপতিত হয়না এবং যে আল্লাহকে বিশ্বাস করে তিনি তার অন্তরকে সুপথে পরিচালিত করেন। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সম্যক অবগত।[4]

 

 

শহীদগণের মর্যাদাও পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হয়েছে-

 

وَ لَا تَقُوۡلُوۡا لِمَنۡ یُّقۡتَلُ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ اَمۡوَاتٌ ؕ بَلۡ اَحۡیَآءٌ وَّ لٰکِنۡ لَّا تَشۡعُرُوۡنَ ﴿۱۵۴﴾

আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃত বলনা, বরং তারা জীবিত; কিন্তু তোমরা তা অবগত নও।[5]

 

وَ لَا تَحۡسَبَنَّ الَّذِیۡنَ قُتِلُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ اَمۡوَاتًا ؕ بَلۡ اَحۡیَآءٌ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ یُرۡزَقُوۡنَ ﴿۱۶۹﴾ۙ

যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে কখনও মৃত মনে করনা; বরং তারা জীবিত, তারা তাদের রাব্ব হতে জীবিকা প্রাপ্ত।[6]

 

 

যেখানে শহীদদের এই মকাম!তাহলে ইমামুস শোহাদা বা শহীদগণের ঈমাম,ইমাম হুসাইন (রাঃ) মর্তবা বা মকাম (অবস্থান) কি হবে!আল্লামা ইকবাল (রহঃ) ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর শাহাদাত এর শানের শ্রেষ্ঠত্ব এভাবে ঘোষনা করেছেন যে!

 

حقیقتِ اَبدی ہے مقامِ شبیّری

بدلتے رہتے ہیں اندازِ کوفی و شامی

 

 

হাদীস শরীফেও দেখা যায়-

 

٢١/٤٠ . عَنْ عَامِرِ بْنِ سَعْدِ الْبَجَلِيِّ قَالَ : لَمَّا قُتِلَ الْحُسَيْنُ بْنُ عَلِيِّ عليه

السلام رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ فِي الْمَنَامِ, ، فَقَالَ : إِنْ رَأَيْتَ الْبَرَاءَ بُنَ عَازِبٍ فَأَقْرِئُهُ مِنِّي السَّلَامَ، وَأَخْبِرُهُ أَنَّ قَتَلَةَ الْحُسَيْنِ بْنِ عَلِيٌّ فِي النَّارِ، وَإِنْ كَادَ اللَّهُ أَنْ يُسْحِتَ أَهْلَ الْأَرْضِ مِنْهُ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ. قَالَ: فَأَتَيْتُ الْبَرَاءَ، فَأَخْبَرُتُهُ، فَقَالَ: صَدَقَ رَسُولُ اللهِ ﷺ ، قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: مَنْ رَآنِي فِي الْمَنَامِ، فَقَدْ رَآنِي، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ لَا يَتَصَوَّرُ بِي.

 

অনুবাদ: ২১/৪০. আমির ইবনু সাআদ আল-বাজালী বলেন:

যখন হুসাইন ইবনু আলী (রাদিআল্লাহু আনহু) শহীদ হন, তখন আমি স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দেখলাম। তিনি বললেন:

 

“তুমি যদি বরাআ ইবনু ‘আযিব-এর সাথে সাক্ষাৎ করো, তাহলে আমার পক্ষ থেকে তাকে সালাম দিও এবং তাকে জানিয়ে দাও—হুসাইন ইবনু আলী (রাযি.)-কে যারা হত্যা করেছে, তারা জাহান্নামে আছে। আল্লাহ অল্পই বাকি রেখেছিলেন, যেন পুরো পৃথিবীর মানুষদের উপর কঠিন শাস্তি নেমে আসে।”

 

আমি বরাআ (রাযি.)-এর কাছে গিয়ে তা জানালাম। তিনি বললেন:

“রাসূলুল্লাহ ﷺ সত্য বলেছেন।”

 

তিনি আরও বলেন:

“রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখেছে, সে আমাকে-ই দেখেছে। কারণ শয়তান আমার রূপ ধারণ করতে পারে না।”[7]

 

ব্যাখ্যা:এই হাদীসে হুসাইন (রাযি.)-এর শাহাদাতের পর আসমানী বার্তা এবং ঘাতকদের পরিণতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। একইসাথে, রাসূল ﷺ-এর স্বপ্নে দেখা সত্য হওয়ার দলীলও এতে উল্লেখ রয়েছে।

 

আলোচ্য হাদীস হতে আমরা প্রমাণ পেলাম যে,তাকদীর লিখনেওয়ালা ফয়সালা করে দিলেন যে,ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর পক্ষে যারা ছিলেন সবাই জান্নাতী এবং যারা বিপক্ষে গিয়েছিল তারা সবাই জাহান্নামী।(নাউজুবিল্লাহ!)

তাকদীর লিখনেওয়ালার পক্ষ থেকে অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ হতে এটি ছিল ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর জন্য ইনাম (প্রতিদান।)

 

 

 

• উপসংহার ➤ ইসলামের আকিদা বা মৌলিক বিষয়সমূহের উপর বিশ্বাসের মানদন্ড নির্বাচন ও নির্ধারণ করলে,ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর পথ ও মত অনুযায়ী চললে নিঃসন্দেহে ইসলামী আকিদার মৌলিক বিষয়গুলো আদায়ের পথ সমুন্নত হবে।এর মাধ্যমে আল্লাহ ও রাসূলে পাক (সাঃ) এর নৈকট্য অর্জনের পথ নির্ধারিত হবে এবং অচিরেই নৈকট্য লাভে সক্ষম হবে।

পূর্বের আলোচনা হতে এটি প্রতীয়মান হয় যে,হুসাইনী মুসলিম বা হুসাইনী সৈনিক হলেই মুক্তির পথ ও জান্নাতের পথ নির্ধারিত।অপরদিকে,ইয়াজিদের সৈনিক বা ইয়াজিদি মুসলমান হলে ধ্বংস ও জাহান্নাম অবধারিত।কেননা,ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর শাহাদাত যদি সেদিন কারবালার জমিনে না হতো!তাহলে ইয়াজিদি হুকুমত (শাসন) সত্য বলে প্রতিপন্ন হতো।পৃথিবীর বুকে ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর জয়জয়কার হতো না।

ইয়াজিদ ও তার দলবল ইমাম হুসাইন (রাঃ) কে শহীদ করে ভেবেছিল তারা জয়লাভ করেছে! অথচ জয়-পরাজয় আল্লাহ পাক হতে নির্ধারিত।কারবালার জমিনে ইমাম হুসাইন (রাঃ) শহীদ হয়েছিলেন ঠিক তবে তিনি পরাজিত হননি।বরং চিরস্থায়ী বিজয় লাভ করেছিলেন।চিরস্থায়ী জান্নাতের সর্দার হয়েছিলেন।পক্ষান্তরে ইয়াজিদ লায়ীন এর মৃত্যু ছিল খুবই কঠোর,ভয়াবহ,অনাহারে।এক ফোঁটা পানিও সে পান করতে পারেনি।মৃত্যুর পূর্বে তাকে পানি পান করানোর চেষ্টা করা হলেও তার কন্ঠনালীর ভেতরে যেত না।তা মুখ থেকে পড়ে যেত।এভাবে সে লাঞ্চিত হতে হতে মৃত্যুবরণ করে এবং চিরস্থায়ী জাহান্নামমুখী হয় এবং জাহান্নামের অধিবাসী হয়।তাই সত্য ও মিথ্যার মধ্যখানে সত্যকে আঁকড়ে ধরতে হলে,ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর অনুসারী হতে হবে।তবেই চিরস্থায়ী মুক্তি অনিবার্য।তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় যে,কারবালার জমিনে ৬১ হিজরিতে ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর শাহাদাত এর মাধ্যমে ইসলামী আকিদা বা বিশ্বাস তার স্ব-মহিমায় প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। (আমিন,সুম্মা আমিন।)

 

#সূত্র

[1] মুস্তাদরিক হাকিম⇨৪র্থ খন্ড⇨হাদিস নম্বার-৮২০২।

⇨তাবরানী-মুজামুল কাবির⇨৩য় খন্ড⇨হাদিস নম্বার-২৮২১।

[2] সুরা আল-আহযাব⇨আয়াত-৩৩।

[3] মাসনাদুল ফিরদাউস-ইমাম দায়লামি (র)⇨৩য় খন্ড⇨হাদিস নম্বার-৪৮৪৭।

আদাবুশ শারইয়্যাহ-ইমাম মাকদিসি (র)⇨৩য় খন্ড।

[4] সুরা আত-তাগাবুন⇨আয়াত-১১।

[5] সুরা আল-বাকারা⇨আয়াত-১৫৩। [6] সুরা আল-ইমরানা⇨আয়াত-১৬৯।

[7] মাসনাদে রু’য়ানী-ইমাম র’য়ানী⇨১ম খন্ড⇨হাদিস নম্বার-৪৩৫।

তারিখে দামেস্ক-ইমাম ইবনে আসাকির (র)⇨১৪তম খন্ড।