মুহাম্মদ রবিউল আলম
প্রভাষক, আল্ কুরআন এণ্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ,
জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসা।
ইমাম জয়নুল আবেদীন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ছিলেন রাসূল বংশের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। অনেক সদগুণের আধার ছিলেন তিনি । তিনি ছিলেন একাধারে প্রথম সারির
তাবেয়ী, আহলে বায়তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লামার সম্মানিত সদস্য ও পবিত্র ইমাম, মুজতাহিদ ও প্রখ্যাত হাদীসবিদ। তাঁর জ্ঞানের গভীরতা সম্পর্কে ইমাম যুহরী আলাইহির রহমাহ বলেন, সে সময় হাশেমী বংশে ইমাম জয়নুল আবেদীন আলী ইবনে হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা থেকে অধিক মর্যাদাসম্পন্ন বুযুর্গ ও বড় ফকীহ আমি দেখিনি। ইমাম যাহাবী
আলাইহির রহমাহ বলেন, ইমাম জয়নুল আবেদীন আলী ইবনে হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা ছিলেন
অধিকতর নির্ভরযোগ্য ও অতীব বিশ্বস্ত হাদীস বর্ণনাকারী।
তিনি অনেক হাদীস শরীফ বর্ণনা করেছেন। তিনি বেলায়তের সর্বোচ্চ সোপান ‘গাউছুল আযম’ পদেও
অধিষ্ঠিত ছিলেন।বলাবাহুল্য, তিনি তদীয় পিতা ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু
তায়ালা আনহু’র খলীফা ছিলেন। এছাড়াও খোদাভীতি,ইবাদত-বান্দেগী, ক্ষমাশীলতা, দানশীলতা, পরোপকারিতাও উত্তম চরিত্রে তিনি ছিলেন কিংবদন্তি মহা ব্যক্তিত্ব ।
নাম ও বংশ পরিচিতি:
তাঁর নাম আলী, উপনাম আবু মুহাম্মদ, আবু বকর, আবুল
হাসান, আবুল হুসাইন উপাধি জয়নুল আবেদীন ও সৈয়্যদুস সাজ্জাদ। তাঁর পিতার নাম সৈয়্যদুশ শুহাদা
হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু। যিনি
হযরত খাতুনে জান্নাত ফাতেমা বিনতে রাসূলিল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আলী ইবনে আবি তালিব ইবনে আব্দুল মোত্তালিব রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা এর
প্রাণপ্রিয় পুত্র। যাঁরা বংশ পরম্পরায় হযরত ইব্রাহীম আলইহিস সালামের প্রথম পুত্র হযরত ইসমাঈল
আলাইহিস সালামের বংশধর। তাঁর মাতার নাম শাহরবানু। ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর নাম মতান্তরে সালমাহ, গাযালাহ, সুলাফাহ, জিদ্দা ও বিরবাহ
শাহরবানু হচ্ছেন পারস্যের শেষ সম্রাট ইয়াজদাযরিছে সুযোগ্য কন্যা। তাঁর বংশ তালিকা হচ্ছে শাহরবানু
ইয়াজদাযরিদ ইবনে (সম্রাট) খসরু পারভেজ ইবনে (সম্রাট) হরমুজ ইবনে (সম্রাট) নাওশীরওয়ান।যাঁরা সবাই বংশ পরম্পরায় পারস্য (ইরান) সম্রাট ছিলেন। যার বংশ পরম্পরায় হযরত ইয়াকুব আলাইহিসালাম হতে হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালামের দ্বিতীয় সন্তান হযরত ইসহাক আলাইহিস সালাম এর বংশধর।
শুভ জন্মক্ষণ:
উপরিউক্ত সম্মানিত পিতা-মাতার ঘর আলোকিত করে হিজরি মতান্তরে ৩৮ হিজরীর ১৫ জমাদিউল আখের মতান্তরে শাবান মাসের শুক্রবার রাতে পবিত্র মদীনাতুল মুনাওয়ারায় শুভ জন্ম গ্রহন করেন ।” অন্য বর্ণনামতে তাঁ
জন্ম সালটি ছিল তাঁর জন্মসাল ছিল ৩৩ হিজরি।
জ্ঞানচর্চা:
তিনি শৈশবকাল থেকে জ্ঞানপিপাসু ছিলেন । তিনি প্রখ্যাত সাহাবী ও তাবেয়ীগণের নিকট কুরআন, হাদিস, ফিকহ ইত্যাদি বিষয় অধ্যয়ন করেন । তিনি হাদিস ও ফিকহ বিষয়ে অগাধ জ্ঞানার্জন করে প্রখ্যাত হাদীসবিদ
প্রথিতযশা ফিকাহবিদ হিসেবে স্বীকৃতি পান সমকালীন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফিকাহবিদগণ কর্তৃক। তাঁর ছিল
অসংখ্য শিক্ষক ও ছাত্র।
শিক্ষকবৃন্দ:
তাঁর অগণিত শিক্ষক ছিলেন । তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন স্বীয় পিতা হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু।
উম্মুল মু’মিনীন হযরত সাফিয়্যাহ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা, হযরত উম্মে সালমা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা,হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা, হযরত আবু
হুরাইরা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আবু রাফি রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত মিসওয়ার বিন মাখরমাহ
রাদ্বিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু, হযরত সায়ীদ ইবনুল মুসায়্যিব
রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু, হযরত সায়িদ ইবনে মারজানাহ
রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু, হযরত আমর ইবনে উসমান
রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত যাকওয়ান রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত যায়নাব বিনতে আবী সালমাহ
রাদ্বিয়াল্লাহ তায়ালা আনহা প্রমুখ ।
ছাত্রবৃন্দ:
তাঁর অসংখ্য ছাত্র ছিল। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন স্বীয়
পুত্র ইমাম আবু জাফর বাকির রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু,
হযরত যাইদ আল মকুতুল রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু,
হযরত আবদুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত ইমাম
যুহরী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আমর বিন দিনার
রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত হাকাম বিন উতাইকা রাদ্বিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু, হযরত যাইদ বিন আসসালাম
রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত ইহইয়া বিন সায়িদ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আবুয যিনাদ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আলী বিন জুয়ান রাদ্বিয়াল্লাহু
তায়ালা আনহু, হযরত মুসলিম আল-বাতীন রাদ্বিয়াল্লাহু
তায়ালা আনহু, হযরত হাবিব ইবনে আবি সাবিত
রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আসিম বিন ওবাইদুল্লাহ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আসিম বিন ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত ক্বা’ক্বা বিন হাকিম
রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আবুল আসওয়াদ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত হিশাম বিন উরওয়াহ
রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আবু যুবাইদ মক্কী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আবু হাযিম আ’রাজ
বাৰিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আবদুল্লাহ বিন মুসলিম বিন হুরমুখ রাখিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত মুহাম্মাদ বিন ফুরাত তামিমী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত মিনহাল বিন আমর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত তাউস
রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আবু সালমাহ রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা প্রমুখ ।
ইবাদত-বন্দেগী:
তিনি অত্যধিক ইবাদত বন্দেগী করতেন, মহান আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে অসংখ্য সাজদাহ প্রদান করেছেন। যে কারণে তাকে সাজ্জাদ বলা হত। আর সাজ্জাদ অর্থ অধিক
সাজদাহ প্রদানকারী । একদা তিনি তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার সময় শয়তান সর্পের আকৃতি ধারণ করে তাঁর সামনে উপস্থিত হয়, যাতে তিনি ভয়ে নামাজ ভঙ্গ করেন। কিন্তু তিনি নামাজের মধ্যে আল্লাহর ধ্যানে এমনভাবে ডুবে গেলেন যে, নামাজ ভঙ্গ তো দূরের কথা সাপটির দিকে নজর পর্যন্ত দেননি। এতে সাপরুনী শয়তানটি নিরুপায় হয়ে তাঁর পায়ের আঙ্গুলে দংশন করলে তিনি অত্যন্ত যন্ত্রণা অনুভব করেন। কিন্তু এতেও তিনি নামাজ ভঙ্গ করলেন না। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁকে জানিয়ে দিলেন সাবধান এটি শয়তান। অতঃপর তিনি শয়তানটিকে ভৎসনা করলেন এবং প্রহার করলেন। এরপর পুনরায় নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে ইলহাম এলো আপনি জয়নুল আবেদীন অর্থাৎ ইবাদতপরায়ণ বান্দাগণের শোভা।” তখন থেকে তিনি ইমাম জয়নুল আবেদীন নামে সর্বাধিক পরিচিতি লাভ করেন। তিনি সর্বদা মহান আল্লাহ তায়ালার ভয়ে কম্পিত থাকতেন। অযু করার পর তাঁর চেহেরা মুবারক হলুদ বর্ণ ধারণ করত এবং নামাজে দাঁড়ানোর পূর্বে মাওলায়ে হাক্বিকীর ভয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকতেন। এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন, আপনারা কি জানেন না, আমি এখন কার সামনে দাঁড়াব এবং কার সাথে কথা বলব ? নামাজে অনেক সময় তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়ে যেতেন। তিনি প্রতিদিন হাজার রাকয়াত নামাজ পড়তেন। তিনি পবিত্রতা অর্জনের সময় কারো সাহায্য নেয়া পছন্দ করতেন না। তাহাজ্জুদের অযু করার জন্য কিছু পানি অন্যের চোখের আড়ালে রেখে দিতেন। তা দিয়ে অযু ও মিসওয়াক করে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতেন। তিনি কখনো তাহাজ্জুদ নামাজ ছেড়ে দেননি। এমনকি সফরের সময়ও নয়।
দানশীলতা:
তিনি বড় দানবীর ছিলেন। দান-দক্ষিণায় তিনি ছিলেন এমন সিদ্ধহস্ত, যা রূপকথার গল্পসমূহকেও হার মানায়। এ প্রসঙ্গে অসংখ্য ঘটনা পাওয়া যায়। তন্মধ্যে কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হল। যখন কোন ভিক্ষুক তাঁর নিকট আসত তখন তিনি তাঁকে শুভেচ্ছা জানাতেন এবং বলতেন, مرحبا بمن يحمل زادي إلى الآخرة আমার সম্পদ যে পরকাল পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয় তাকে স্বাগতম। তিনি গোপনে সদকাহ করা বেশ পছন্দ করতেন। এজন্য তিনি রাতে সদকাহ করতেন। তিনি কখনো কখনো ছদ্মবেশে মানুষকে দান করতেন। হযরত মুহাম্মদ বিন ইসহাক (আলাইহির রহমাহ) বলেন, আমরা মদীনাবাসী অনেকেই জানতাম না আমাদের জীবিকা কোথেকে আসে। হযরত ইমাম জয়নুল আবেদীন (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা’র) ওফাতের পর আমাদের জীবিকা তথা রাতের ছদকাহ বন্ধ হয়ে গেলে আমরা বুঝতে পারি যে, উপরিউক্ত ছদক্বাহসমূহ ইমাম জয়নুল আবেদীন (রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু)র পক্ষ থেকে আসত।তিনি ছদকাহ প্রদানের সময় অন্যের সাহায্য নিতেন না যাতে হুদক্বাহের গোপনীয়তা রক্ষা হয়। থেকে আসত।” তিনি ছদক্বাহ প্রদানের সময় অন্যের হযরত আমর বিন ছাবেত (আলাইহির রহমাহ) বর্ণনা হবেন, হযরত ইমাম জয়নুল আবেদীন (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)র ওফাতের পর তাঁকে গোসল দেয়ার সময় তাঁর পিঠে কালো দাগ দেখা যায়। যেটা রাতে গোপনে ছদকাহ করার সময় আটা ইত্যাদির বস্তা বহনের দাগ। এভাবে তিনি ছদকাহ করতেন। আর অন্যকেও ছদকাহ করার পরামর্শ দিতেন। হযরত আবু হামজা (আলাইহির রহমাহ) বলেন, ইমাম জয়নুল আবেদীন রাতে আটার বস্তা নিজ কাঁধে বহন করে সদকাহ করতেন। তিনি বলতেন, ان صدقة السر تطفىء غضب الرب عز و جل সদকাহ আল্লাহ তায়ালার রাগকে প্রশমিত করে।”
ক্ষমাশীলতা:
ইমাম জয়নুল আবেদীন ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত ক্ষমাশীল ছিলেন। ক্ষমা মহত্বের লক্ষণ প্রবাদটি তাঁর জীবনে সম্পূর্ণরূপে প্রতিফলিত হয়েছিল। কেউ তাঁকে কষ্ট দিলেও তিনি তাকে হাসিমুখে ক্ষমা করে দিতেন। তাঁর ক্ষমাপরায়নতার অনেক ঘটনা বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত আছে। তা থেকে কয়েকটি বিবৃত হলঃ
একদা জনৈক ব্যক্তি এসে তাঁকে বললেন, অমুক ব্যক্তি আপনার সমালোচনা করছে। একথা শুনে তিনি বলেন আমাকে তার কাছে নিয়ে চলুন। লোকটির নিকট পৌছে তিনি বলেন, আপনি যা কিছু আমার সর্ম্পকে বলেছেন, তা যদি আমার নিকট বিদ্যমান থাকে তাহলে আমি আল্লাহ তায়ালার সকাশে ক্ষমা চাই। আর যদি তা আমার মধ্যে বিদ্যমান না থাকে, আল্লাহ রব্বুল আলামীন আপনাকে ক্ষমা করুক।অনুরূপ, জনৈক ব্যক্তি তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলে, তিনি বলেন, আমার শানে আপনি যা বলেছেন তা যদি সত্য হয় আল্লাহ তায়ালা আমাকে ক্ষমা করুন। যদি অসত্য হয় আল্লাহ তায়ালা আপনাকে ক্ষমা করুক। একথা শুনে লোকটি ইমাম সাহেবের মাথায় চুম্বন করে বলেন, আমার জীবন আপনার জন্য উৎসর্গ করলাম।
আমি মিথ্যা বলেছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। ইমাম সাহেব বললেন, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। হযরত আব্দুল গফুর ইবনে কাসি আলাইহির রহমাহ থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন, ইমাম জয়নুল আবেদীন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মসজিদের বাইরে ছিলেন এমতাবস্থায় জৈনিক ব্যক্তি তাকে গালি দিতে আরম্ভ করলে তাঁর গোলামরা লোকটিকে আঘাত করতে উদ্যত হলে বললেন তোমরা তাঁকে বলতে অবকাশ দাও এবং তিনি লোকটির কাছে গিয়ে বলেন, আমার ব্যাপারে আপনার যা বলার আছে বলে যান। এরপর তিনি তাঁর গায়ের কাপড় লোকটিকে দান করলেন এবং তাকে আরো এক হাজার দিরহাম দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। এতে লোকটি লজ্জিত হল এবং বলল, أشهد أنك من أولاد الرسول “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি সত্যিই আওলাদে রাসূল।
ব্যক্তিত্ব:
যাঁরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই ওয়াসাল্লামকে সন্তুষ্ট করেছেন, আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিজগতকে তাঁদের অনুগত করে দেন। উমাইয়া খলীফা ওয়ালিদ বিন আব্দিল মালিকের রাজত্বকালে তাঁর ও গভর্নর হিশাম বিন আব্দিল মালিক হজ্ব পালন কালে হাজরে আসওয়াদে চুমু দিতে চাইলে মানুষের ভিড়ের কারণে চেষ্টা করেও হাজরে আসওয়াদের নিকটেও যেতে সক্ষম হননি। পরিশেষে তাঁর জন্য একটি মিনার স্থাপন করা। তিনি তথায় বসেন। এমতাবস্থায় হযরত ইমাম জড় আবেদীন আলাইহিস সালাম হাজরে আসওয়াদে চুমু খেতে এলে সকলে তাঁকে অত্যন্ত সম্মান দেখালেন এবং জায়গা করে দিলেন। এতে তিনি সহজেই হাজরে আসওয়াদে চুমু খেয়ে আসলেন। উক্ত ঘটনা দ্বারা আবারো প্রমাণিত যে, যিনি আল্লাহ তায়ালার হয়ে যান, প্রত্যেক কিছু তাঁর হয়ে যায়। এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে জনৈক শামবাসী হিশাম বিন আব্দিল মালিককে জিজ্ঞেস করেলেন,এ সুন্দর ব্যক্তিটি কে? যার জন্য সবাই সরে গেল এবং শ্রদ্ধা প্রদর্শন করল। হিশাম না চেনার ভান করে বলেন আমি তাঁকে চিনিনা। তখন সেখানে আরবের প্রখ্যাত কবি ফারাজদা উপস্থিত ছিলেন। তিনি হিশামের কথার জবাবে বললে আমি তাঁকে চিনি। অতঃপর তিনি হযরত ইমামের প্রশংসায় অনেকগুলো কাছিদা রচনা করে আবৃত্তি করস শোনালেন। কাছিদার এক পর্যায়ে তিনি বলেন, لذي। تعرف البطحاء وطاته والبيت يعرفه والحل والحرم “(শুধু আমি তাঁকে চিনি তাই নয়) বরং এ মহান ব্যক্তিকে চেনেন মক্কা শরিফের হারাম, হিল বায়তুল্লাহ শরীফসহ সমতল ভূমিও”। হিশামের জন্য এ যেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা। কারণ আওলাদে রাসুলের সম্মান দেখে প্রথমে তার অন্তরে প্রতিহিংসার বীজ জন্মেছে এবং কবিতায় ইমামের প্রশংসা শুনে কবি ফারাজদাককে বন্দী করার নির্দেশ দিয়ে প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। ইমাম জয়নুল আবেদীন এ ঘটনা জেনে কবির জন্য মর্মাহত হন এবং বন্দী অবস্থায় কবির পারিবারিক অবস্থার প্রতি বিবেচনা করে কবির জন্য বার হাজার দিরহাম প্রেরণ করেন। কিন্তু কবি ফরাজদক সম্মানের সাথে তা গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন। কেননা কবির উদ্দেশ্য ছিল আওলাদে রাসূল-এর প্রতি মহব্বত প্রকাশ করে আল্লাহ তায়ালা ও তদীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র সন্তুষ্টি অর্জন করা। কিন্তু ইমাম পুনঃরায় অনুরোধ করলে কবি তা গ্রহণ করেন।
কারবালা-যুদ্ধ
আল্লামা শাইখ আব্দুর রহমান চিশতী (আলাইহির রহমাহ)’র মতে কারবালা যুদ্ধের সময় ইমাম জয়নুল আবেদীন (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) ‘র বয়স ছিল তেইশ বছর। ২৬ কারবালার হুসাইনী কাফেলায় তিনি অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কিন্তু মারাত্মক রোগ ও প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। তিনি রোগগ্রস্ত অবস্থায়ও হেলে দুলে স্বীয় পিতা হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়ালহু তায়ালা আনহু’র সামনে এসে আরজ করলেন, আব্বাজান। আমাকেও যুদ্ধের জন্য বিদায় দিন। আমি যুদ্ধ করে শাহাদত বরণ করতে চাই। ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু পুত্রকে সান্ত্বনা দেন এবং বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, হে জয়নুল আবেদীন! তোমাকেও যদি বিদায় দিই, তাইলে আমি ইমাম হুসাইনের সিলাসিলা কার মাধ্যমে জারী থাকবে? বেটা! তোমার মাধ্যমে আমার বংশীয় সিলাসিলা জারী থাকবে। আমি দোয়া করি আল্লাহ তায়ালা তোমাকে জীবিত রাখুন এবং তোমার মাধ্যমে আমার বংশ ও সিলাসিলা জারী থাকুক। অত:পর ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম ইমাম জয়নুল আবেদীন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে বাতেনী খেলাফত ও ইমামত প্রদান করেন এবং বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বাতেনী নেয়ামত ও ফুযুজাতে ভরপুর করে দেন। আর কিছু অসিয়তের পর ইরশাদ ফরমান, বেটা! আমি চলে যাওয়ার পর মদীনা মুনাওয়ারায় পৌঁছার যদি সৌভাগ্য হয়,
তাহলে সবার আগে আমাদের মহামান্য নানাজান সাল্লাল্লাহ তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লামা’র রওজায়ে আক্বাদাছে আমার নূরানী সালাম পেশ করবে এবং তোমার দেখা সমস্ত ঘটনা শুনাবে। পরবর্তীতে ইমাম জয়নুল আবেদীন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তার পিতা কর্তৃক অর্পিত সমস্ত দায়িত্ব অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। পরিশেষে মারাত্মক রোগ ও পিতার তুলে দেয়া দায়িত্বের জন্য তিনি লড়াইয়ে অংশ নিতে পারেননি। সে সুবাদে ইমাম জয়নুল আবেদীনের দ্বারা হুসাইনী তরীক্বা ও বংশধারা এখনো পৃথিবীতে জারী রয়েছে।
বৈবাহিক জীবন:
হযরত ছৈয়দুনা ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু’র কন্যা হযরত উম্মে আব্দুল্লাহ্ ফাতিমা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা’র সাথে ইমাম জয়নুল আবেদীন আলী ইবনে হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বিবাহ বন্ধনে আবন্ধ হন।
ইমাম জয়নুল আবেদীন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু’র পনেরজন পুত্রসন্তান ছিলেন। তাঁরা হলেন: হযরত ছৈয়্যিদুনা ইমাম মুহাম্মদ বাকির রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আব্দুল্লাহ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত উমর আল আশরাফ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত জায়দ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত হুসাইন আল আছগর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, আলী ইবনু আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত হাছান রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত হাছান আল আছগর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আব্দুর রহমান রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত মুহাম্মদ আল আছগর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত কাছিম রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত ঈসা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত সুলাইমান রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আব্দুল্লাহ আল আছগর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত দাউদ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু।তাঁর কন্যা সন্তান ছিলেন আট জন মতান্তরে সাতজন। তাঁরা হলেন: হযরত খাদিজা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা, হযরত উম্মে হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা, হযরত আবিদা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা, হযরত ফাতিমা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা, হযরত উম্মে কুলছুম রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা, হযরত উলাইয়্যা বা আলিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা, হযরত উম্মে জাফর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা ও হযরত জয়নাব রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা।
কারামত:
হযরত ইমাম জয়নুল আবেদীন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু’র অসংখ্য কারামত রয়েছে। তা থেকে কয়েকটি নিম্নে পেশ করা হল।
এক. ইমাম নির্বাচন
ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু’র শাহাদাতের পর ইমাম জয়নুল আবেদীন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ইমাম নির্বাচিত হন। এ ব্যাপারে তাঁর চাচা হযরত মুহাম্মদ ইবনে হানফিয়্যাহ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু দ্বিমত পোষণ করলে, ইমাম জয়নুল আবেদীন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, চাচাজান ইমামতের অধিক হকদার কে তা হজরে আসওয়াদ ফায়সালা করবে। আমরা তাকে জিজ্ঞেসা করব যাতে আমাদের প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট হয়ে যায়। অতঃপর তিনি রাজী হলে উভয়ে মিলে হাজরে আসওয়াদের সমীপে গেলেন এবং ইমাম জয়নুল আবেদীন বললেন, চাচাজান আপনি হাজরে আসওয়াদের সাথে কথা বলুন। তিনি কথা বললে কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। অত:পর ইমাম জয়নুল আবেদীন দু’হাত তুলে আল্লাহ রব্বুল আলামীনের সকাশে দোয়া করা আরম্ভ করলে, হজরে আসওয়াদ কথা বলা শুরু করে। অতঃপর তিনি হজরে আসওয়াদের দিকে মুখ করে বললেন, ঐ আল্লাহ পাকের শপথ, যিনি তাঁর বান্দাদের প্রতিশ্রুতি তোমার ওপর রেখেছেন। তুমি আমাদের বলে দাও ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম এর পর ইমামতের হক্কদার কে? সুস্পষ্ট আরবী ভাষায় হাজরে আসওয়াদ বলে দিল, হে মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়্যাহ একথা তো সুস্পষ্ট ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর পর ইমামত ও অসিয়তের হকদার হযরত জয়নুল আবেদীন আলী ইবনে হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু।
এ অলৌকিক ঘটনার পর ইমাম জয়নুল আবেদীনের প্রতি মুহাম্মদ ইবনু হানাফিয়্যার ভালবাসা ও বিশ্বাস আরো বৃদ্ধি পেল।
দুই. প্রবল আগুনের মধ্যেও অক্ষত
তিনি যখন মহান আল্লাহ তায়ালার ইবাদতে মগ্ন হতেন, তাঁর কাছে তখন পার্থিব কোন কিছুর খবর থাকত না। তিনি তখন সকল কৃত্রিমতা পরিহার করে সম্পূর্ণ একাগ্রতা ও একনিষ্ঠাতার সাথে খোদা প্রেমে বিভোর হয়ে যেতেন। যার সুবাদে ফানাফিল্লাহ হয়ে বাকাবিল্লায় পৌঁছে যেতেন।একদিন তিনি ঘরে নামাজরত অবস্থায় ছিলেন এমতাবস্থায় ঘরে আগুন লেগে যায়। চতুর্দিক থেকে চিৎকার করেও কেউ তাঁকে ঘর থেকে বের কর পারেন নি। তিনি নামাজ অবস্থায় রয়ে গেলে পরে দেখা গেল সম্পূর্ণ ঘর জ্বলে গেলেও তাঁর দে ক্ষতি হয়নি। সাজদাহ অবস্থায় তাঁকে পাওয়া গেল ঘর হতে বের না হওয়ার কারণ জিজ্ঞেসা করলে তিনি বলেন, আখিরাতের আগুনের ভয়ে আমি বের হইনি।
তিন.বন্দী অবস্থা থেকে অলৌকিকভাবে মুক্তি লাভ
ইমাম যুহরী আলাইহির রহমাহ বর্ণনা করেন, একদা আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের নির্দেশে হয় ইমাম জয়নুল আবেদীনকে বন্দী করা হয়। আমি ইমাম সাহেবকে দেখার জন্য গেলাম। গিয়ে দেখলাম ইমাম সাহেব হাত-পায়ে লোহার শিকল দ্বারা বাঁধা অবস্থায় আছেন। এ অবস্থা দেখে আমি কেঁদে ফেললাম এবং বললাম আপনার স্থানে যদি আমি হতাম এবং আপনি নিরাপদে থাকতেন তাহলে ভাল হত, আমিও খুশি থাকতাম। একথা শুনে ইমাম সাহেব বললেন, আপনি মনে করেছেন আমি কষ্টে আছি। প্রকৃতপক্ষে তা নয়, কারণ আমি যদি চাই হাত-পায়ে কিছুই থাকবেনা। এ অবস্থায় আমি এজন্য রয়েছি যে, যাতে লোকেরা আমাকে দেখে পরকালের শাস্তির কথা স্মরণ করে। এরপর তিনি তাঁর হাত-পায়ের শিকল খুলে ফেললেন এবং বললেন, হে যুহরী। আমি এই অবস্থায় আর বেশি সময় থাকবনা। কারারক্ষীরা বর্ণনা করল, আমরা ঘুমিয়ে সারারাত তাঁকে পাহারা দিলাম। কিন্তু সকালে দেখি তিনি (ইমাম জয়নুল আবেদীন) কারাগারে নেই। সেখানে আছে বরং তাঁকে পরানো শিকলগুলো। আমরা ইমাম সাহেবকে তালাশ করা জন্য মদীনা শরীফে গিয়েও তাঁকে খুঁজে পাইনি ইমাম যুহরী আলাইহির রহমাহ বলেন, এ ঘটনা শুনে আমি বাদশাহ আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানে কাছে গেলে বাদশাহ আমার কাছে ইমাম জয়নুল আবেদীনের কামালিয়্যাত সম্পর্কে জানতে চান আমি আমার জ্ঞানানুযায়ী ইমাম সাহেব বাদশাহের নিকট বর্ণনা করলাম। তা শুনে বাদশাহ আব্দুল মালিক বলেন, যেদিন ইমাম জয়নুল আবেদীন শামে (সিরিয়া) বন্দীশালা থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন, সেদিন তিনি আমার কাছে আসলেন এবং বললেন তোমার ও আমার মাঝে সমস্যাটা কি? আমি বললাম আপনি একটু অপেক্ষা করুন। তিনি বললেন, আমি এখানে অপেক্ষা করতে আসিনি। এ বলে তিনি চলে গেলেন। বাদশাহ বলেন মহান আল্লাহ তায়ালার কসম সেদিন তাঁর জালালিয়াত দেখে আমি অত্যন্ত ভয় পেয়ে ছিলাম।
চার. হরিণের অভিযোগ ও এর সমাধান
ইমাম জয়নুল আবেদীন তাঁর সাথীদের সাথে কোন ময়দানে উপবিষ্ট ছিলেন। হঠাৎ একটি হরিণ এসে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে মাটিতে পদাঘাত করে উচ্চস্বরে আওয়াজ করতে শুরু করল। উপস্থিত সকলে জিজ্ঞেস করলেন, হুজুর। এ হরিণটি কি বলছে? তিনি বললেন হরিণটি অভিযোগ করছে যে জনৈক ব্যক্তি গতকাল তার বাচ্চা নিয়ে গেছে এবং তাকে দুধ পান করাতে পারেনি। ইমাম ঐ ব্যক্তিকে ডেকে এনে বললেন, এহরিণটির বাচ্চা তুমি নিয়ে এসেছ। সে গতকাল থেকে ঢাকে দুধ পান করাতে পারেনি। তাই সে আমাকে অনুরোধ করেছে যে, আমি যাতে তোমার নিকট থেকে বাচ্চাটি নিয়ে তাকে দুধ পান করানোর সুযোগ দিই এবং সে দুধ পান করিয়ে চলে যাবে। ঐ ব্যক্তি বাচ্চাটি এনে দুধ পান করানোর জন্য তার মাকে দিল আর মা তার বাচ্চাকে দুধ পান করানোর পর পুনরায় ফিরিয়ে দিল। ইমাম ঔ ব্যাক্তিকে বাচ্চাটি ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ জানালে সে অনুমতি দেয়। তিনি হরিণ শাবকটিকে আজাদ করে দিলে হরিণটি উচ্চ আওয়াজ করে চলে যাচ্ছে। উপস্থিত সাথীরা জিজ্ঞেস করলেন হুজুর এটি কী বলছে? তিনি বললেন, সে তার ভাষায় বলছে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উত্তম প্রতিদান প্রদান করুন।
অমূল্য বাণী:
ইমাম সাহেবের অমূল্য বাণীসমূহ থেকে কয়েকটি নিম্নে বিবৃত করা হল।
➤হযরত ইমাম জয়নুল আবেদীন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ইরশাদ করেন যে, যাঁরা আল্লাহর ভয়ে ইবাদত করেন, তাঁদের ইবাদত প্রকৃত বান্দার ইবাদত। যাঁরা কোন কিছুর কামনায় ইবাদত করেন, তাঁদের ইবাদত ব্যবসায়ীদের ইবাদত। যাঁরা আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করার জন্য ইবাদত করেন, তাঁদের ইবাদত স্বাধীন ব্যক্তির ইবাদত।
➤তিনি আরো ইরশাদ করেন, আমি বিস্মিত হই সে অহংকারীদের জন্য, যারা এক ফোঁটা নাপাক পানি থেকে জন্মগ্রহণ করেছে। আর কাল পচে যাবে। তাঁদের প্রতি সবচেয়ে বেশি হতবাক হই যারা আল্লাহর সৃষ্টি জগতকে দেখেও আল্লাহ তায়ালাকে (অস্তিত্বের ব্যাপারে) সন্দেহ করে। আর তাকেও দেখে আশ্চর্যবোধ করি যে, পার্থিব জীবনের জন্য আমল করে, কিন্তু পরকালের জন্য কিছুই করে না।
➤তিনি আরো ইরশাদ করেন, যে আল্লাহ তায়ালার বণ্টনে সন্তুষ্ট, সেই বড় ধনী।
➤তিনি আরো ইরশাদ করেন, কিয়ামত দিবসে অহবানকারী বলবেন, হে ধৈর্যধারণকারীগণ! তাঁরা দাঁড়াবেন এবং তাঁদের বলা হবে তোমরা কিসের ওপর ধৈর্যধারণ করেছ। তাঁরা উত্তরে বলবেন, আমরা আল্লাহ রব্বুল আলামীনের আনুগত্যের উপর ধৈর্যধারণ করেছিলাম। এরপর তাঁদের বলা হবে। তোমরা সত্য বলেছ এবং জান্নাতে প্রবেশ কর।
ইমাম বাক্বির রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, আমার পিতা ইমাম জয়নুল আবেদীন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আমাকে অসিয়ত করেছেন, তোমরা পাঁচ শ্রেণীর লোকের সংস্রবে যাবে না। আমি জানতে চাইলাম এরা কারা। জবাবে বলেন, এরা হল জঘন্য অপরাধী, কৃপণ, মিথ্যুক, জাহেল এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী।
➤তিনি আরো ইরশাদ করেন, হে ইরাকবাসী, তোমরা আমাদের ইসলামকে ভালবাসার মত ভালবাস, মূর্তিকে ভালবাসার মত নয়, যা আমাদের জন্য লজ্জার কারণ হয়।
পবিত্র ওফাত শরীফ:
সৈয়্যদুনা হযরত ইমাম জয়নুল আবেদীন আলী ইবনে হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু নির্ভরযোগ্য বর্ণনা মতে, ৯৯ হিজরি সনের ১৪ রবিউল আউয়াল মতান্তরে ১৮ মুহররাম রাতে আল্লাহর প্রেমে ওফাত প্রাপ্ত হন এবং তাঁকে জান্নাতুল বাক্বী শরীফে সমাহিত করা হয়।”
প্রয়োজনীয়তার উপর প্রথমে কুরআন ও হাদীসের অভাটা দলিল এরপর যুক্তিনির্ভর দলিল এবং সর্বশেষ হাদীস অস্বীকারকারীদের আপত্তি ও তার খণ্ডন পেশ করার প্রয়াস পাচ্ছি।
কুরআনে পাকের অকাট্য দলিল
১ নম্বর দলিল: আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ ফরমান-
باليها الذين امنوا أطيعوا الله وأطيعوا الرسول وأولي الأمر منكم
অনুবাদ- হে ঈমানদারগণ। তোমরা আল্লাহ্ তা’আলার নির্দেশ মান্য কর এবং রসূলের নির্দেশ মান্য কর আর তাদেরই- যারা তোমাদের মধ্যে ক্ষমতায় অধিষ্টিত। সূরা নিসা: ৫৯।
কুরআনে পাকের উপর আমল করা আল্লাহ্ তা’আলার নির্দেশ মান্য করা, হাদীস শরীফের উপর আমল করা রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে মান্য করা আর ফোকাহায়ে কেরামকে মান্য করাই হচ্ছে ওলীল আমরকে মান্য করা। আর সেজন্য সাধারণ সাহাবায়ে কেরাম ফকীহ সাহাবীগণকে মান্য করতেন।
২ নম্বর দলিল: আল্লাহ্ পাক রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন- ويعلمهم الكتاب والحكمة
অনুবাদ- নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁদেরকে কিতাব তথা কুরআন এবং হেকমত তথা হাদীস শিক্ষা দিবেন। (সুরা-বাকারা-১২৯)
যদি হাদীস শরীফের প্রয়োজনীয়তা না থাকতো তাহলে আল্লাহ কুরআনে পাকের সাথে হাদীস শরীফের আলোচনা কেন করলেন?
ما اتاكم الرسول فخذوه ومنهاكم عنه فانتهوا
অনুবাদ- নবী-এ দো’জাঁহা সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ করো আর যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো ।(সূরা- হাশর:৭]
যদি শুধু কুরআনের উপর আমল করলে যথেষ্ট হতো তাহলে আল্লাহ তা’আলা এভাবে বলতেন, যা আমি দিয়েছি তা গ্রহণ করো আর আমি যা নিষেধ করেছি তা বর্জন করো। অথচ আল্লাহ তা’আলা নবীজির কথা এ জন্যই বলেছেন যে, কুরআন ও হাদীস উভয়টি নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সম্পৃক্ত।
৪ নম্বর দলিল: আল্লাহ্ তা’আলা বলেন-
من يطع الرسول فقد اطاع الله
অনুবাদ- যে রসূলে আকদাস সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে মান্য করল সে স্বয়ং আল্লাহ্ তা’আলাকে মান্য করল। (সূরা- নিসা: ৮০)
তাহলে এটাই স্পষ্ট হলো যে, কুরআন ও হাদীসের মর্যাদা একই হাদীসের উপর আমল করাও আল্লাহ তা’আলার আনুগত্যের নামান্তর।
৫ নম্বর দলিল।
واللين اذا ذكروا بايت ربهم لم يقروا عليها صما وعميانا
অনুবাদ- এবং ওই সব লোক যারা এমনি যে, যখন তাদেরকে তাদের প্রভুর নিদর্শন সমূহ স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, তখন সেগুলোর উপর বধির ও অন্ধ হয়ে পতিত হয়।(সুরা ফোরকান,৭৩)
৬ নম্বর দলিল: আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ ফরমান-
ويحرم عليهم الخيانت
অনুবাদ-নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাদের উপর অপবিত্র বস্তুসমূহ হারাম করবেন (সুরা- আরাফ ১৫৭)
তাহলে বুঝা গেল যে, হাদীসে পাক থেকেও নিষেধ সাব্যস্ত হয়। যেমন- কুকুরও গাধা ইত্যাদি হারাম হওয়া। যা
হাদীস দ্বারাই প্রমাণিত।
فلا وربك لايتومنون حتى يحكموك فيما شجر بينهم
অনুবাদ- সুতরাং হে মাহবুব। আপনার রবের শপথ, তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ তাদের
পরস্পর ঝগড়া মিটাতে আপনাকে বিচারক মানবে না।
[সুরা-নিসা ৬৫]
অর্থাৎ হুযুর পাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে বিচারক মানার অর্থ এই যে, নবীজির প্রত্যেক কথার উপর আমল করা। আর এটাই হচ্ছে হাদীসকে মান্য করা।
৮ নম্বর দলিল: نا نحن نزلنا الذكر وانا له لحافظون
অনুবাদ- নিশ্চয় আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি আর আমিই এর সংরক্ষক। (সুরা- হিজর:৯)
অতএব, এর দ্বারা প্রতীয়মান হলো যে, আল্লাহ্ তা’আলা কুরআন এর শব্দ, অর্থ, বিধান এবং কুরআনে পাকের নিগূঢ় তথ্যসমূহের সংরক্ষণকারী। সে জন্যেই হাফেজ, ক্বারী এবং আলেমগণ কিয়ামত অবধি অবশিষ্ট থাকবেন। আর হাদীস শরীফ হচ্ছে কুরআন শরীফের বিধান সমূহের মাধ্যম। যদি হাদীস না হতো তাহলে সালাত তথা নামায শব্দটি শুধু শাব্দিকভাবে সংরক্ষণ থাকতো। তবে নামায কি স্বর্ণ না রৌপ্য আর যাকাত কি কাপড় না অন্য কোন জিনিস তা বুঝা যেতনা। হাদীসের মাধ্যমেই আমরা সর্বপ্রকার বিধান সবিস্তারে জানতে পেরেছি। তাইতো হাদীস হচ্ছে কুরআনকে বুঝার একমাত্র মাধ্যম। কুরআন সংরক্ষণের সব চেয়ে বড় মাধ্যম হচ্ছে হাদীস শরীফ।