প্রিয়নবী (ﷺ)’র দুনিয়াতে শুভাগমন

আহকার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম 

 

সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য যিনি সকল সৃষ্টি জগতের প্রতিপালক। দরুদ ও সালাম তার হাবীব হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা আহমদ মুজতবা ﷺ পূতপবিত্র আহলে বাইত ও হেদায়াতের সিতারা সাহাবা কেরাম (রা.) এর ওপর।

মানব ইতিহাসে নবী-রাসূলগণ মানবজাতিকে সঠিক পথের দিশা দিতে আগমন করেছেন।

কিন্তু মহানবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ)-এর আগমন অন্য সব নবীর আগমনের তুলনায় ভিন্ন মাত্রা ও বৈশিষ্ট্য বহন করে। তিনি শুধু একটি জাতি বা অঞ্চলের নবী নন; বরং “رحمة للعالمين” সমস্ত জগতের জন্য রহমত”।’ [1]
তাঁর আগমনের মাধ্যমে ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা হয়; যে যুগে আধ্যাত্মিকতা, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও আল্লাহ তাআলার তাওহীদের আলো সর্বজনীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

মহানবী ﷺ এর দুনয়িাতে আগমন সমগ্র মানব জাতির জন্য রহমতে এলাহি তথা ঐশ্বরিক রহমত আগমনের একটি অভিব্যক্তি ছিল। আর এ রহমত কখনোই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং যুগের ব্যপ্তির সাথে তা বেড়েই চলবে। কেননা, ইরশাদ হচ্ছে : وآخرين منهم لما يلخلوا بهم

“এ রাসুল প্রেরিত ﷺ হয়েছেন আরও লোকদের জন্যে যারা এখনো তাদের সাথে মিলিত হয়নি।” [2]

তাঁর আগমণে বিশ্বজাহান সীমাহীন আনন্দে ও পরম আবেসে দুলছিল। নবী করিম ছিলেন বিশ্বের জন্য খুশি, নেয়ামত। কবি আহমদ শাওকী (র.) রাসুল এর শানে যথার্থই বলেছেন:

ولد الهدى فالكائنات ضياء … وقم الزمان تبسم وثناء الروح والملأ الملايك حوله … للدين والدنيا به بشراء والعرش برهو، والخطيرة تزدهي …. والمنتقى، والسدرة العضماء

সত্যের দিশারীর আগমনে আলোকিত কুল জাহান, ক্রান্তি লগণেও যুগ আজি মুচকি হেসে গাইছে নাত।

____________________

[1] আল-আম্বিয়া: ১০৭।

[2] সুরা জুমুয়া ৩।

চারিপাশে তাঁর রুহ ও ফেরেশতা সব আছে দন্ডায়মান, দীন ও দুনিয়ার তরে তিনি এসেছেন নিয়ে আশির্বাদ।

নবীজি (ﷺ)’র আগমনপূর্ব আরব সমাজের প্রেক্ষাপট

সামাজিক অবক্ষয়

নবীজি (ﷺ)’র আগমনের পূর্বে আরব সমাজ নৈতিক ও মানবিক দিক থেকে মারাত্মক অবক্ষয়ের মধ্যে ছিল। গোত্রভিত্তিক বিভাজন, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, নারী অবমাননা এবং দাসপ্রথা ছিল দৈনন্দিন জীবনের অংশ। ইবনে কাসীর উল্লেখ করেন যে, ‘আরবদের মধ্যে শক্তিই ছিল ন্যায়বিচারের মাপকাঠি।”[3] দুর্বল গোত্র ও নারী-শিশুরা সর্বদা নিপীড়িত হতো।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি

মক্কা শরিফ বাণিজ্যের কেন্দ্র হলেও অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল প্রকট। কুরাইশ গোত্র বাণিজোর প্রভাবশালী শক্তি হলেও সাধারণ মানুষ ঋণ, সুদ ও দারিদ্র্যে পিষ্ট ছিল। এ অবস্থাকে পবিত্র আল-কুরআন পরে আঘাত হেনেছে: ويل للمطففين “ধ্বংস তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়।” [4]

ধর্মীয় অস্থিরতা

কাবা শরিফ ছিল ইবরাহিম (আ.)-এর তাওহীদের কেন্দ্র, কিন্তু তা মূর্তিপূজায় আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল। ৩৬০টি মূর্তি সেখানে প্রতিস্থাপিত ছিল। [5] খ্রিষ্টান ও ইহুদি প্রভাব আরবের প্রান্তে থাকলেও প্রকৃত তাওহীদের আলো ছিল নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো।

__________________________
[3] ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খন্ড ২।

[4] *সূরা আল-মুতাফিফীন: ১

[5] *ইবনে ইসহাক, সীরাতু রাসূলাল্লাহ ﷺ

প্রিয়নবী (ﷺ)’র আগমন ও ঐতিহাসিক বর্ণনা

আগমনের সময় ও স্থান

প্রিয়নবী (ﷺ) আগমন করেন রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ, ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে )عام الفيل হাতির বছর), মক্কার কুরাইশ বংশে। তাঁর জন্মগৃহ আজ “মওলিদুন্নবী” নামে পরিচিত। [6]

আগমনের ঘটনা

বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ আছে-

• কিসরা (পারস্য সম্রাট)-এর প্রাসাদের ১৪টি স্তম্ভ ভেঙে পড়ে।

• আগুন-উপাসকদের অগ্নিকুণ্ড যা এক হাজার বছর ধরে জ্বলছিল তা নিভে যায়।

• সাওয়া হ্রদ শুকিয়ে যায় ইত্যাদি। [7]

এসব ঘটনাকে ইতিহাসবিদেরা প্রতীকী ভাষায় বর্ণনা করেছেন-অন্ধকার ও মূর্তিপূজার যুগের অবসান এবং তাওহীদের আলোর আবির্ভাব।

আগমনের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

আল্লাহ তাআলা বলেন: قد جاء كم من الله نور وكتاب مبين ” তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে নূর এবং সুস্পষ্ট কিতাব।” [8]

মুফাসসিরগণ এখানে ‘নূর’ শব্দ দ্বারা নবী (ﷺ)-কে বুঝিয়েছেন।” [9]

সুফি সাধকদের দৃষ্টিভঙ্গি

সুফিরা নবীর জন্মকে নূর মুহাম্মদী (ﷺ)-এর প্রকাশ হিসেবে দেখেন। ইমাম জাজুলি বলেছেন-“নবীর জন্ম হলো আল্লাহর রহমতের নূর, যা সমগ্র জগতকে আলোকিত করেছে।” [10]

_________________________
[6] ‘ইবনে হিশাম, সীরাহ।

[7] ‘ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খঃ ২।

[8] সূরা আল-মায়েদা: ১৫।

[9] তাফসীর আল-কুরতুবি।

[10] জাজুলি, দালাইলুল খায়রাত।

কবিতায় রূপায়ণ

ইমাম বুসিরি (রহ.) লিখেছেন:

“ولدت فاشترقت الكوبين بياولد” “আপনার জন্মের আলোয় দুই জগতই [11] মহিমান্বিত হলো।””

বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যে নবীজির আগমনচিত্র

বাংলা সাহিত্য

বাংলা মুসলিম কবিতায় নবীজির জন্ম আলোচিত হয়েছে এক আধ্যাত্মিক উৎসব হিসেবে।

গোলাম মোস্তফা (বিশ্বনবী) লিখেছেন:

“যেদিন এসেছিলে তুমি ধরায়, আলো ছড়িয়েছিল চাঁদ-সূর্য-তারায়।”

কাজী নজরুল ইসলাম নবীপ্রেমে উচ্ছ্বসিত হয়ে লিখেছেন:

‘নবীর চরণে মোর প্রাণ ভাসে,

আলোর বন্যা আসে।”

আরবি ও ফার্সি সাহিত্য

আরবি ও ফার্সি কাব্যে মাওলিদ বিষয়ক অসংখ্য কাসিদা রচিত হয়েছে। বিশেষত বুসিরির কাওকাবাতুল বুরদাহ এবং ইবনে দাহিয়ার তানবিহুল মাওলিদ প্রসিদ্ধ।

পাশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গি

Karen Armstrong নবীজির জন্মকে ইতিহাসের অন্যতম “Transformative Birth” আখ্যা দিয়েছেন।” [12]
____________________
[11] “বুসিরি, কাওকাবাতুল বুরদাহ

[12] “Karen Armstrong, Muhammad: A Prophet for Our Time, 2006

নবীজির জন্ম ও আধুনিক একাডেমিক বিশ্লেষণ

সভ্যতার সন্ধিক্ষণ

Montgomery Watt বলেন, নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর আগমন ছিল “A Civilizational Turning Point”-যেখানে বর্বর সমাজ রূপান্তরিত হয়েছিল নৈতিক সভ্যতায়।” [13]

মানবিক বিপ্লব

নবীর জন্মের পর তাঁর জীবনপ্রবাহ এক নৈতিক বিপ্লব এনেছিল-দাসমুক্তি, নারীসম্মান, সাম্যবাদী অর্থনীতি। এ সবই তাঁর জন্মের রহমতের ধারাবাহিকতা।

মিলাদ শরিফ ও নবীপ্রেমের সাহিত্যিক রূপায়ণ

মাওলিদ মাহফিল

মুসলিম উম্মাহ নবীর জন্মদিনকে ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মিলাদ মাহফিল উদযাপন করেছেন। ইমাম সুয়ুতি (রহ.) মিলাদ শরিফ উদযাপনকে “মুবারক কাজ” বলেছেন। [14]

প্রকৃতপক্ষে নবী-রাসূল (আলাইহিমুস সালাম) এর আগমনে সৃষ্টি জগত শান্তিতে ভরে গিয়েছিল। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন:

وَالسَّلَامُ عَلى يَوْمَ وَلِدْتُ وَيَوْمَ أَمُوتُ وَيَوْمَ أَبْعَثُ حَيًّا.

(হযরত ঈসা আ. বললেন) আমার প্রতি সালাম যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি। যেদিন আমি মৃত্যুবরণ করবো এবং যেদিন আমি পুনরুজ্জিবীত হয়ে উত্থিত হবো।” [15]
_________________________
[13] Montgomery Watt, Muhammad at Mecca, 1953)

[14] “ইমাম সুয়ুতি, হুসনুল মাকসিদ ফি আমালিল মাওলিদ।
[15] সুরা মারইয়াম: ৩৩।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:

لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ (337) فَإِنْ تولوا قفل حسبي الله لا إله إلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ

তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসুল। তোমাদের দুঃখ, কষ্ট তাঁর পক্ষে দুঃসহ। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মু’মিনদের প্রতি স্নেহশীল, দয়াময়। এসত্ত্বেও যদি তারা বিমুখ হয়ে থাকে, তবে তাদেরকে বলে দাও, আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট। তিনি ব্যতিত আর কারো বন্দেগী নেই। আমি তারই ভরসা করি এবং তিনিই মহান আরশের অধিপতি।” [16]

আল্লাহ তায়ালা আরো ইরশাদ করেন:

لقَد من الله عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بعث فيهم رَسُولًا مِنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ والحكمة وإن كانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلالٍ مُبِينٍ.

আল্লাহ ঈমানদারদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মাঝে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে এককজন নবী পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন। তাদেরকে পরিশোধন করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও কাজের কথা শিক্ষা দেন। বস্তুত তারা ছিল পূর্ব থেকেই পথভ্রষ্ট। [17]

ইসলামী আধ্যাত্মিক সংগীত

নবীপ্রেম প্রকাশে নাত, হামদ ও কাওয়ালি একটি আধ্যাত্মিক ধারা তৈরি করেছে। বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশে নাতশরীফ মাওলিদের অনুষঙ্গ।

সমসাময়িক সাংস্কৃতিক গুরুত্ব

বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ মুসলিম বিশ্বে আজও ১২ রবিউল আউয়ালকে আলো, পতাকা, নাত ও মাহফিল দিয়ে উদযাপন করা হয়-যা নবীর জন্মকে জীবন্ত সংস্কৃতিতে রূপ দিয়েছে।

______________
[16] সুরা তওবা : ১২৮-১২৯
[17] সুরা আলে ইমরান: ১৬৪

উপসংহার

প্রিয়নবী (ﷺ)’র জন্ম মানবতার জন্য এক নতুন ভোর। তিনি এমন এক সমাজে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যেখানে অন্ধকার ছিল সর্বব্যাপী, অথচ তাঁর জন্মের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল আলোর যুগ। ইসলামী দলিল, সুফি আধ্যাত্মিকতা, বাংলা ও বিশ্বসাহিত্য এবং আধুনিক গবেষণা-সবখানেই তাঁর জন্মকে মানবতার জন্য এক চূড়ান্ত দয়া হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।

তাঁর জন্ম আমাদের শিক্ষা দেয়-

• আলোর উৎস হতে হলে ত্যাগী হতে হবে।

• প্রেম ও করুণা দিয়ে মানবতা নির্মাণ সম্ভব।

• নবীর জন্মকে স্মরণ করা মানে শুধু উৎসব নয়, বরং মানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করা।

তথ্যসূত্র (References)

1. আল-কুরআন

2. ইবনে ইসহাক, সীরাতু রাসূলিল্লাহ ﷺ

3. ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খণ্ড ২

4. আল-কুরতুবি, তাফসীরুল কুরতুবি

5. আল-বুসিরি, কাওকাবাতুল বুরদাহ

6. ইমাম জাজুলি, দালাইলুল খায়েরাত

7. ইমাম সুয়ুতি, হুসনুল মাকসিদ ফি আমলিল মাওলিদ

8. Montgomery Watt, Muhammad at Mecca, Oxford, 1953

9. Karen Armstrong, Muhammad: A Prophet for Our Time, HarperCollins, 2006

10. গোলাম মোস্তফা, বিশ্বনবী

11. কাজী নজরুল ইসলাম, নির্বাচিত কবিতা

আহকার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম