হাদীসের আলোকে ফরয নামাযের পর হাত তোলে মুনাজাত

মুহাম্মদ রবিউল আলম

প্রভাষক, আল্ কুরআন এণ্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ

জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসা

ভূমিকা: চাওয়ার সাথে পাওয়ার সম্পর্ক নিতান্তই নিবিড়। কিছু পাওয়ার জন্যই মূলত সমার্থক। ‘মুনাজাত’ শব্দটি যদিও বা আরো ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। মুনাজাত আমাদের চাওয়া হয়। এ চাওয়ার নাম হল ‘দুআ’ বা প্রার্থনা। আবার ‘মুনাজাত’ শব্দটিও এই দেশে ‘দুআ’ অর্থেই প্রচলিত। প্রার্থনার নাম যেটাই হোক; এর বৈধতা নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। এভাবে হাত তোলে দুআ করার বৈধতা নিয়েও দ্বিমত থাকার কথা নয়। কারণ শতাধিক সহীহ হাদীস শরীফ দ্বারা তা প্রমাণিত। বর্তমানে কিছু লা-মাযহাবী ফরয নামাযের পর সম্মিলিতভাবে হাত তোলে দুআ বা মুনাজাত করার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বলে, ‘এটি বিদআত কাজ।’ এমনকি তারা এও বলে, ‘এটা কোন সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয় বা রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো ফরয নামাযের পর সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করেন নি।’ প্রবন্ধে হাদীসের আলোকে এ সমস্যাটির নিরসনের চেষ্টা করা হয়েছে।

উপরিউক্ত মাসআলাটি বোধগম্যের জন্যে কয়েকটি বিষয় জানা প্রয়োজন-

এক. আমল করার ক্ষেত্রে কোন হাদীস গ্রহণযোগ্য; আর কোন হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়- তা জানা। আমলযোগ্য হাদীস চার প্রকার। ১. সহীহ লিযাতিহি ২. সহিহ লিগাইরিহি ৩. হাসান লিযাতিহি ৪. হাসান লিগাইরিহি। তাছাড়া বিবিধ ক্ষেত্রে ‘দয়ীফ’ হাদীসও আমলযোগ্য। এ বিষয়ে সকল ইমাম একমত। সলফে সালেহীনের যুগ থেকে অদ্যাবধি এর ওপরই আমল করে আসছেন। বর্তমানে কতিপয় বিদাআতী আলিম আমল করার জন্যে শুধু ‘সহীহ হাদীস’ই গ্রহণীয় বলে অভিমত ব্যক্ত করে। তারা মনে করে, অন্য কোন প্রকার হাদীস আমলযোগ্য নয়। তাদের এ রকম ধ্যান-ধারণার কারণেই মূলত ইসলামে নতুন বিদআতী ফিরকা লামাযহাবীর জন্ম হয়েছে। কারণ তারা সহীহ হাদীস ছাড়া আর কিছুই মানতে চায় না। তাদের এমন গর্হিত চিন্তা-ধারা ও মানসিকতা মূলত জ্ঞানস্বল্পতারই পরিচায়ক। কেননা, মুতাকাদ্দেমীন ফকীহগণ এবং মুহাদ্দীসগণ ‘সহীহ হাদীস’কে যেভাবে আমলযোগ্য বলেছেন, সেভাবে অবশিষ্ট তিন প্রকার হাদীসকেও আমলযোগ্য বলেছেন।
এক কথায় তাঁদের মতে, আমলযোগ্য হাদীস চার প্রকার। যারা বলে, ‘ শুধু সহীহ হাদীসের ওপর আমল করা যাবে। আর অন্য কোন প্রকারের হাদীসের ওপর আমল করা যাবে না। তারা হাদীস বিশারদদের ‘নীতি’ মানে না। যদি তাঁদের নীতি না মানে, তাহলে তারা কোন হাদীসকে সহীহও বলতে পারবে না। কারণ হাদীস ‘সহীহ’ হওয়াটাও তাদের পরিভাষা। নয়তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে এবং সাহাবায়ে কিরাম তাবেয়ীনদের যুগে কোন হাদীসকে সহীহ হাদীস বলা হত না। তাঁদের যুগে হাদীসের কোন পরিভাষাই সৃষ্টি হয়নি; বরং এ পরিভাষাগুলি অনেক পরে বিজ্ঞ হাদীস বিশারদগণ কর্তৃক রচিত হয়েছে। তাঁদের রীতি-নীতি মানলে হাদীস বিজ্ঞানের পুরো পরিভাষাই মানতে হবে। কিছু মানব আর কিছু মানব না- এমন হতে পারে না। যদি মুহাদ্দিসগণের পুরো রীতি-নীতি মানতে চাও, তাহলে আমলযোগ্য সকল হাদীসের ওপর আমল করতে হবে। আর যদি কোন রীতি-নীতি ও পরিভাষা না মান, তাহলে সকল প্রকার হাদীসের ওপর সমানভাবে আমল করতে হবে। শুধু সহীহ হাদীসের ওপর আমল করার কথা বলা যাবে না। কারণ এমতাবস্থায় কোন হাদীসকে ‘সহীহ’ বা ‘দ্বয়ীফ’ বা অন্য কিছুই বলা যাবে না। বরং রাসূলের হাদীস হিসেবে সব হাদীসই আমলযোগ্য হবে। তারা যেহেতু সহীহ হাদীস-এর ওপর আমল করার কথা বলে, সেহেতু হাদীসের রীতি-নীতি ও পরিভাষাও তাদের মানতে হবে। মুহাদ্দিসগণের দেয়া ‘সহীহ হাদীস’ পরিভাষাটি মানলাম; কিন্তু তাঁদের অভিমত অনুযায়ী উপরিউক্ত চার প্রকারের হাদীসের উপর আমল করা যাবে, সেটি মানলাম না। এটি কোন বিবেকসম্পন্ন মানুষের কথা হতে পারে না।

উল্লেখ্য, ‘সহীহ হাদীস’ এর পরিচয় আলেমগণের না জানার কথা নয়; কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে অনেকে বলে থাকে যে, ‘সহীহ হাদীস’ মানে শুদ্ধ হাদীস। আর ‘গায়রে সহীহ’ অর্থ অশুদ্ধ হাদীস। সুতরাং অশুদ্ধ বা ভুল হাদীসের ওপর কীভাবে আমল করা যাবে। এটি গভীর ষড়যন্ত্র। ‘সহীহ’ শব্দের প্রকৃত অর্থ হলো সুস্থ। হাদীসের ক্ষেত্রে ‘সহীহ’ শব্দের প্রয়োগ রূপকার্থে। ‘সহীহ’ শব্দটি ‘শুদ্ধ’ অর্থে কিছুটা প্রযোজ্য হলেও, এর বিপরীত শব্দ গায়রে সাহীহ অর্থ ‘অশুদ্ধ’ বা ভুল নয়। সুতরাং হাদীসটি সহীহ নয়- এর অর্থ ‘হাদীসটি অশুদ্ধ বা ভুল’ এ অর্থ নয়। বরং এর সঠিক অর্থ হল- ‘যে শর্তাবলির কারণে হাদীস ‘সহীহ’ হয়; সেই শর্তগুলোর মধ্যে কোন একটিতে ঘাটতি থাকলে হাদীসটি হাসান বা অন্য কোন প্রকারের মধ্যে পরিগণিত হয়। কারণ ‘সহীহ হাদীস’ বলতে শুধু শুদ্ধ হাদীসটিকে বুঝায় না বরং পাঁচ শর্তযুক্ত হাদীসকে ‘সহীহ’ বলা হয়।নতুবা উপরিউক্ত আমলযোগ্য চার প্রকার হাদীসের অবশিষ্ট তিন প্রকারও কিন্তু শুদ্ধ ও আমলযোগ্য হাদীস। এজন্য মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় বাংলা ‘শুদ্ধ’ শব্দটি আবরী ‘সহীহ’ শব্দের সমার্থক যেমন কে বুঝায় না; বরং পাঁচ শর্তযুক্ত হাদীসকে ‘সহীহ’ বলা হয়। নতুবা উপরিউক্ত এর কেমনি অশুদ্ধ বা ভুল শব্দদ্বয় আবরী ‘গায়বে সহীহ’ শব্দটির সমার্থক নয়।

এই সকল সহীহ হাদীস কি বুখারী ও মুসলিম শরীফে সংরক্ষিত নাকি অন্য কিতাবেও এসেছে? এ প্রশ্নের উত্তর জানা লামাযহাবীদের জন্য একান্ত প্রয়োজন। যারা বুখারী ও প্রেম গ্রন্থদ্বয়ের হাদীস ছাড়া অন্য কোন হাদীস গ্রন্থের হাদীসকে মানতে চায় না, এমনকি ঘর গ্রন্থের সহীহ হাদীসকেও মানতে নারাজ। তাদের বিশ্বাস মতে, অন্য কোন গ্রন্থে খাঁর হাদীস’ নেই। তাদের এমন বিশ্বাসের সাড়তা তাদের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও প্রথাযোগ্য ব্যক্তিত্ব ইমাম বুখারী (রাহ.) ও মুসলিম (রাহ.)-এর উক্তির মধ্যেই নিহিত। ইমাম বুখারী (রাহ.) বলেন-

أحفظ مائة ألف حديث صحيح

আমার এক লক্ষ সহীহ হাদীস মুখস্থ আছে।” তিনি আরো বলেন-

و تركت من الصحاح أكثر

বুখারী শরীফে যা অন্তর্ভুক্ত করেছি, এর চেয়ে অধিক সহীহ হাদীস আমি ছেড়ে দিয়েছি।’২

ইমাম মুসলিম বলেন-

ليس كل شيء عندي صحيح وضعته ههنا، إنما وضعت ما أجمعوا عليه

মামার কাছে যত সহীহ হাদীস রয়েছে, তা কিন্তু আমি মুসলিম শরীফে অন্তর্ভুক্ত করেনি; বরং শুধু হাদীস বিশারদগণ একমত হয়েছেন এমন সব হাদীসকে (মুসলিম শরীফে)

1.মাহমূদ তাহহান, তাইসীরু মুছতালাহিল হাদীস, (দামেস্ক: মাকতাবাতল মা’আরিফ, ১০ম সংস্করণ, ১৪২৫হি), পৃ.৪৯।
২.প্রাগুক্ত

লিখেছি।” তাঁদের স্বীকৃতি মতে, সকল সহীহ হাদীস বুখারী ও মুসলিম শরীফে সংরক্ষিত নেই: বরং বুখারী শরীফে পুনরুল্লেখ ছাড়া মাত্র চার হাজার এবং মুসলিম শরীফেও প্রায় চার হাজার সহীহ হাদীস রয়েছে। ইমাম বুখারীর ভাষ্যমতে, তাঁর এক লক্ষ সহীহ হাদীস মুখস্থ ছিল: কিন্তু তিনিতো মাত্র চার হাজার হাদীস বুখারীতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অবশিষ্ট ৯৬ হাজার সহীহ হাদীসগুলো কোথায়? এর জবাবে ড. মাহমূদ তাহহান বলেন-

ابن نجد بقية الأحاديث الصحيحة التي فاتت البخاري ومسلما؟ – تجدها فى الكتب المعتمدة المشهورة، كصحيح ابن خزيمة وصحيح ابن حبان، ومستدرك الحاكم، والسنن الأربعة، وسنن الدارقطني، وسنن البيهقي، وغيرها .

‘বুখারী ও মুসলিম শরীফে অলিখিত সহীহ হাদীসগুলো আমরা কোথায় পাব? (উত্তরে বলেন, হাদীসের নির্ভরযোগ্য প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহ যেমন ‘সহীহু ইবনে হুযাইমাহ, ‘সহীহু ইবনে হিব্বান’, ‘মুস্তাদরাকুল হাকিম’, সুনানু আরবাআহ্’, ‘সুনানুন নাসায়ী’, ‘সুনানুল বায়হাকী’ ইত্যাদি গ্রন্থে তোমরা এসব সহীহ হাদীস পাবে।”
সুতরাং প্রমাণিত হল যে, বুখারী ও মুসলিম শরীফ ছাড়াও অন্যান্য হাদীসগ্রন্থেও অসংখ্য সহীহ হাদীস রয়েছে। অতএব বুখারী ও মুসলিম শরীফসহ অন্যন্যা হাদীস গ্রন্থের হাদীসের ওপরও আমল করা যাবে।

তিন. ফরয নামাযের পর দুআ করার কারণ জানা। যে কোন সময় দুআ করা যায়; তবে দুআ কবুলের বিশেষ সময়ও রয়েছে। দুআ কবুলের বিশেষ সময়ের মধ্যে ফরয নামাযের পরের সময়ও অন্তর্ভুক্ত। এ প্রসঙ্গে হযরত আবূ উমামাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন,

قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ : أَيُّ الدُّعَاءِ أَسْمَعُ ؟ قَالَ : جَوْفَ اللَّيْلِ الآخِرِ، وَدُبُرَ الصَّلَوَاتِ الْمَكْتُوبَاتِ

‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাস করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! কোন সময়ের দুআ বেশি কবুল হয়? তিনি বলেন, রাতের শেষ ভাগ এবং ফরয নামাযসমূহের

1. প্রাগুক্ত, পৃ.৪৮।

2. প্রাগুক্ত, পৃ.৪৯।

পরের সময়ে করা দুআ ।এ হাদীস শরীফের উপর আমল করে, ফরয নামাযের পর দুআ প্রতি উৎসাহিত করা হয়। এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযীর মতে, ‘হাসান’ আর ইবনে হাজার আসকালানীর মতে, ‘সহীহ’। এ বিষয়ে আরো বহু হাদীস রয়েছে। নামাযের পর যারা দুআ করেন, তাঁরা হাত তোলে দুআ করেন। কারণ এটি দুআ কবুলের উত্তম পদ্ধতি। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

إن ربكم تبارك وتعالى حبي كريم، يستَحْيِي مِنْ عَبْدِهِ إِذا رَفَعَ يَدَيْهِ إِلَيْهِ أن يرقهما من

নিশ্চয়ই তোমাদের মহান প্রতিপালক অধিক লজ্জাশীল ও দয়ালু। তাঁর কোন বান্দা যখন হাত তুলে দুআ করে, তখন তিনি(আল্লাহ তায়ালা) তার হাত খালি অবস্থায় ফেরত দিতে লজ্জাবোধ করেন। সুনানু আবী দাউদের পাদটীকায় লাহাযহাবীদের আলিম নাসিরুদ্দিন আলবানী এই হাদীসকে ‘সহীহ’ বলেছেন। ৪

যারা ফরজ নামাযের পর হাত তোলে দুআ করা নিয়ে কোনো বৈধতা নেই,নেই কোনো বাঁধাও। যারা ফরজ নামাজের পর সম্মিলিতভাবে হাত তোলে দুআ করার পক্ষে নয়, তারাও কিন্তু হাত না সব নামাযের পর কিছু দোয়া পাঠ করে। এখন জানার বিষয় হল, ফরয নামাযের পর দুআর মধ্যে তোলে দোয়া করা যাবে কি না। রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনি দুআ করতেন, তখনি উভয় হাত উত্তোলন করেই দুআ করতেন। দুআর মধ্যে হাত তোলার ব্যাপারটি শতাধিক হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত। দুআর স্থান ও ক্ষেত্র যদিও ভিন্ন ভিন্ন; দুআর মধ্যে হাত তোলার ব্যাপারটি একই। শতাধিক হাদীস বুখারী-মুসলিম শরীফসহ অন্যন্যা হাদীসগ্রন্থে রয়েছে। এ হাদীসগুলো থেকে ৫৪টি হাদীস সংগ্রহ করে ইমাম জালাল উদ্দিন সুয়ূতী আলাইহির রাহমাহ্

فض الوعاء في أحاديث رفع اليدين بالدعاء

১.ইমাম তিরমিযী, আস্ সুনান (মিশর: মাতুবাআতু মুস্তাফা, ২য় সংস্করণ, ১৩৯৫ হি.), খ.৫, পৃ.৫২৬, হনা-৩৪৯৯।

২.মুল্লা আলী ক্বারী, মিরকাতুল মাফাতীহ, (বৈরুত: দারুল ফিকর, ১ম সংস্করণ, ১৪২২হি.), খ.২, ১৭৬৮, হা.নং-৯৬৮।

৩.মিম আবূ দাউদ, আস সুনান, (বৈরুত: আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যাহ), খ.২,পৃ.৭৮, হা.নং-১৪৮৮।
৪.প্রাগুক্ত।

নামক পুস্তিকাটি রচনা করেন। এ পুস্তিকার সকল হাদীস হাত তোলে দুআ করার বিষয়টি যখন সাধারণভাবে অসংখ্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, সেহেতু ফরজ নামাজের পরের দোয়াতেও হাত তোলে দোয়া করার বৈধতাও প্রমাণিত হয়।কারণ অন্যান্য দোয়ার মত এটাও তো দোয়া।তাছাড়া দোয়ার মধ্যে হাত তোলাটা দোয়ার আনুষাঙ্গিক বিষয়।তাছাড়া এ বিষয়ে সরাসরি সহীহ হাদীসও রয়েছে।তা থেকে কয়েকটি সূত্রসহ উল্লেখ করা হলো:
এক, হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন-

ان رسول الله صلى الله عليه وسلم رفع يديه بعد ما سلم وهو مستقبل القبلة فقال اللهم خلص الوليد بن الوليد وعباس بن أبي ربيعة وسلمة بن هشام وضعفة المسلمين الذين لا يستطيعون حيلة ولا يهتدون سبيلا من أيدي الكفار

‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাম ফিরানোর পর কিবলামুখী হয়ে উভয় হাত তোলে দুআ করেছেন। তিনি দুআ করেন-

اللَّهُمَّ خَلْصِ الْوَلِيدَ بْنَ الْوَلِيدِ وَعَيَّاش بن أبي ربيعة وَسَلَمَةَ بْنَ هِشَامٍ وَضَعَفَةَ الْمُسْلِمِينَ الَّذِينَ لَا يَسْتَطِيعُونَ حِيلَةً ولا يهتدون سبيلا من أيدي الكفار

‘হে আল্লাহ! আপনি ওয়ালিদ বিন ওয়ালিদ, আইয়াশ বিন আবী রাবিয়াহ্, কৌশল অবলম্বনে অক্ষম, দুর্বল তাঁদেরকে মুক্তি দিন এবং কাফেরদের হাত থেকে মুক্তি লাভের দিশাহীন মুসলমানদেরকেও মুক্ত করুন।” এ হাদীস শরীফ থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযের পর হাত তোলে মুনাযাত করেছেন। এ কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত।

1. ইবনু আবী হাতিম, তাফসীরুল কুরআনিল কারীম, (সৌদি আরব: মাকতাবাতু নাজ্জার মুস্তফা আল-বায, ৩য় সংস্করণ, ১৪১৯হি.), খ.৩, পৃ.১০৪৮, হা.নং-৫৮৭২; ইবন কসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আজীম, (বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪১৯হি.), খ.২, পৃ.৩৪৫; আব্দুর রহমান

মুবারকপুরী, তুহফাতুল আহওয়াযী, (বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ), খ.২,পৃ.১৭০।

হাদীসের মান যাচাই করা যাক। এ হাদীসের সনদ বা বর্ণনা সূত্রটি হল-

حدثنا أبو معمر المقرى حدثني عبد الوارث حدنا على بن زيد عن سعيد بن المس

هريرة

এ সূত্রে পাঁচজন বর্ণনাকারী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন বুখারী শরীফের বর্ণনাকারী,কয়েকজন মুসলিম শরীফের বর্ণনাকারী।একজন সাহাবী।সূত্রটি বুখারী ও মুসলিম শরীফের সমমানের হওয়ায় হাদীস শরীফটি বুখারী ও মুসলিম শরীফের সমপর্যায়ের।আল্লামা ইবনে কাসীর (রাহ.) এ হাদীসকে ‘সহীহ’ বলেছেন।’ সুতরাং প্রমাণিত হল যে, এটি সহীহ হাদীস। সহীহ হাদীস দ্বারাই ফরয নামাযের পর হাত তোলে দুআ করার বৈধতা যোগিত হলো। এ হাদীসের সমার্থক অন্য একটি হাদীসে বর্ণিত আছে, হযরত আবু হুরাইরা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন-

أنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، كَانَ يَدْعُو فِي دُبُرِ صَلَاةِ الظهر : اللهم خلص الوليد بن الوليد وَسَلَمَةَ بْن هِشَامٍ، وَعَيَّاش بن أبي ربيعة، وَضَعَفَةَ الْمُسْلِمِينَ مِنْ أَيْدِي الْمُشْرِكِينَ الذين لا يسلم. حِيلَةً، وَلَا يَهْتَدُونَ سَبِيلًا

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহরের ফরয নামাযের পর দুআ করেন-

اللهُمَّ خلص الْوَلِيدَ بْنَ الْوَلِيدِ وَعَيَّاش بْنَ أَبِي رَبِيعَةَ وَسَلَمَةَ بْنَ هِشَامٍ وَضَعَفَةُ الْمُسْلِمِينَ الدين يَسْتَطِيعُونَ حِيلَةً وَلَا يهتدون سبيلا من أيدي الكفار

“হে আল্লাহ! আপনি ওয়ালিদ বিন ওয়ালিদ, আইয়াশ বিন আবী রাবিয়াহ্ কৌশল অবলম্বনে হজম, দুর্বল তাঁদেরকে মুক্তি দিন এবং কাফেরদের হাত থেকে মুক্তি লাভে দিশাহীন মুসলমানদেরকে মুক্ত করুন।’২

১.ইদন কসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আজীম, প্রাগুক্ত, খ.২, পৃ.৩৪৫।

২.ইমাম আহমদ, আল-মুসনাদ, (বৈরুত: মুয়াচ্ছাসাতুর রিসালা, ১ম সংস্করণ ১৪২১হি.), খ.১৫, পৃ.১৬২,
হা.নং-৯২৮৫।

এ হাদীস শরীফটি উল্লেখ করার পর ইমাম ইবন কাসীর (রাহ.) বলেন,

وَلِهَذَا الْحَدِيثِ شَاهِدٌ فِي الصَّحِيحِ مِنْ غَيْرِ هَذَا الْوَجْهِ كَمَا تَقَدَّمَ

এ হাদীসের ‘শাহেদ’ বা সমার্থক সহীহ হাদীস রয়েছে, যা পূর্বোক্ত অন্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।’ এছাড়া উদ্দেশ্য হল প্রথম হাদীসটি উল্লেখের পরই এটি উল্লেখ করেছেন। প্রথম হাদীসে যুহরের নামাযের কথা উল্লেখ নেই। এ হাদীস থেকে স্পষ্ট হল যে, যুহরের নামাযের পর রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত তোলে দুআ করতেন।

দুই. হযরত মুহাম্মদ বিন আবী ইহইয়া (রহ.) বলেন-

رَأَيْتُ عَبْدَ اللَّهِ بنِ الزُّبَيْرِ، وَرَأَى رَجُلًا رَافِعًا يَدَيْهِ يَدْعُو قَبْلَ أَنْ يَفْرَغَ مِنْ صَلَاتِهِ، فَلَمَّا فَرَغَ مِنْهَا، قَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يَكُنْ يَرْفَعُ يَدَيْهِ، حَتَّى يَفْرَغَ مِنْ صَلَاتِهِ

‘আমি দেখেছি যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা.) জনৈক ব্যক্তিকে নামায শেষ না করে দু’হাত তোলে দুআ করতে দেখেছেন। ওই ব্যক্তি নামায শেষ করার পর, হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যুবাইর রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায শেষ না করে হাত তোলে দুআ করতেন না। তিনি নামায শেষ করেই হাত তোলে দুআ করতেন।’২

এ হাদীসের সনদ বা বর্ণনা সূত্র হল-

1. ইবন কসীর, তাফসীরু কুরআনিল করীম, প্রাগুক্ত, খ.২, পৃ.৩৪৫।

2. ক. ইমাম সুয়ূতী, ফাদ্দুল বিআ’ (জর্দান: মাকতাবাতুল মানার), পৃ.৮৬; ইমাম তাবারানী, আল-মু’জামুল কবীর, (কায়রো: মাকতাবাতু ইবনে তাইমিয়াহ্, ২য় সংস্করণ),

খ. ১৩,পৃ.১২৯, হা.নং:৩২৪; আবূ আবদিল্লাহ মাকদাসী, আল-আহাদীসুল মুখতারাহ্, (কায়রো: মাকতাবাতুর নাহদাতুল হাদীসাহ্, ১৪১০ হি.),

গ . ৯, পৃ.৩৩৬: আব্দুর রহমান মুবারকপুরী, তুহফাতুল আহওয়াযী, (বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ),

ঘ. ২.পৃ.১০০: নূরুদ্দিন আলী হায়ছমী, ‘মাজমাউয যাওয়ায়েদ’, (কায়রো: মাকতাবাতুল কুদস, ১৪১৪ হি.), খ.১০, পৃ.১৬৯, হা.নং-১৭৩৪৫।

حدثنا سليمان بن الحسن العطار، قَالَ: حَدَّثنا أبو كامل الجحدري قال: خلال ال سليمان، قال: حدثنا محمد بن أبي يحي، قال: رأيت عبد الله بن الزبير

এ সূত্রে হাদীসটি ইমাম সুয়ূতী (রহ.) ‘ফাদ্দুল ভিআ’, ইমাম তাবারনী (রহ.) ‘আল কবীর’, আল্লামা আবূ আবদিল্লা মাকুদাসী (রহ.) ‘আল আহাদীসুল মুখতারাহ’, আব্দুর রহমান মুবারকপুরী (রহ.) ‘তুহফাতুল আহওয়াযী’ এবং নুরুদ্দিন হায়ছমী মাজমাউয যাওয়ায়েদ’ গ্রন্থে হাদীসটি উল্লেখ করার পর বলেন, ى رجاله ثقات হাদীসটির বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য।”

হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন-

أَتَى رَجُلٌ أَعْرَابِي مِنْ أَهْلِ الْبَدو إلَى رَسُول الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ فقال يا رب الله هلكت الْمَاشِيَةُ هَلَكَ الْعِبَالُ هَلَكَ النَّاسُ فَرَفَعَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم يتو وَرَفَعَ النَّاسُ أَيْدِيَهُمْ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَدْعُونَ

জৈনিক গ্রামবাসী জুমার দিনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে কেন, হে আল্লাহর রাসূল! (প্রচন্ড খরার কারণে) জনগণ, আমাদের পরিবার ও পশুগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। (এ কথা শুনে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআ করার জন্য তাঁর উভয় হাত উত্তোলন করলেন। রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে উপস্থিত জনতার সকলেই হাত তুলে দুআয় অংশগ্রহণ করলেন।” রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে নিয়ে জুমার দিনে সম্মিলিতভাবে হাত তোলে দুআ করেছেন। রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কাছে পানি চেয়ে দুআ করেছেন। এ জন্য সম্মিলিতভাবে হাত তুলে দুআ করাটা পানি চাওয়ার জন্য

১.প্রগুক্ত।

২. ইমাম বুখারী, সহীহুল বুখারী, (কায়রো: দারুশ শিয়াব, ১ম সংস্করণ, ১৯৮৭ইং), খ.২, পৃ.৩৯, হা.নং-১০২৯।

নির্দিষ্ট নয়;বরং যেকোনো দুয়ার ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য।এজন্য ইমাম বুখারী (রহঃ) নিজেই এ হাদীসটি ‘কিতাবুদ দায়াওয়াত’ এ উল্লেখ করে বুঝিয়েছেন যে,যেকোনো দোয়ায় হাত তোলার ক্ষেত্রে এ হাদীসটিও দলীল। এ হাদীস থেকে বোঝা গেল যে, রাসুলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই সাহাবী কেরামগণকে নিয়ে হাত তোলে দুআ করেছেন। আর সম্মিলিতভাবে দুআ করলে, দুআ কবুল হবার সম্ভাবনাও বেশি। এ প্রসঙ্গে হযরত হাবীব বিন মাসলামা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা বলেন-

سبعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : لا يجتمع ملا فيدعو بعضهم، ويؤمن البعض ، إلا

أجابهم الله

‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ইরশাদ করতে শুনেছি যে. একাধিক মানুষ একত্র হয়ে কোন ব্যক্তি দুআ করলে, আর অন্যরা ‘আমীন’ বললে, আল্লাহ তায়ালা তাদের দুআ কবুল করেন।”

বুখারী শরীফের হাদীস দ্বারা সম্মিলিতভাবে হাত তুলে দুআ করার বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পর, নামাযের পর সম্মিলিতভাবে হাত তুলে দুআ করার বৈধতাও অনেকটা বোঝা যায়। কিন্তু এ বৈধতা অনেকের কাছে অস্পষ্টও মনে হতে পারে। তাই তাদের জন্য অন্য একটি সহীহ হাদীসও উল্লেখ করা হলো। হযরত ছাওবান রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

وَلَا يَوْمُ قَوْمًا فَيَخْصُ نَفْسَهُ بِدَعْوَةٍ دُونَهُمْ حَتَّى يَنْصَرِفَ.

‘কেউ জনসাধরণের ইমামতি করলে, সে মুসল্লীগণের জন্য দুআ না করে, শুধু নিজের জন্য দুআ করে যেন চলে না যায়।” হাদীসটি ইমাম বুখারী (রাহ.) তাঁর কিতাব “আল আদাবুল

মুফরাদ” গ্রন্থে উল্লেখ করার পরে বলেন- أَصَحُ مَا يُرْوَى فِي هَذَا الْبَابِ هَذَا الْحَدِيثُ

1 ইমাম হাকিম, আল মুস্তাদরাক, (বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪১১হি.), খ.৩, পৃ.৩৯০, হা.নং- ৫৪৭৮।

2. ইমাম বুখারী, আল আদাবুল মুফরাদ, বৈরুত: দারুল বাশায়েরুল ইসলামিয়্যাহ্, ৩য় সংস্করণ, ১৪০৯হি.), পৃ.৩৭৫, হা.নং-১০৯৩।

এ অধ্যায়ে বর্ণিত হাদীসগুলোর মধ্যে এ হাদীসটি সবচেয়ে ‘সহীহ’।” এ উক্তিটি ইমাম বুখারী (রাহ.) নিজের। তাঁর স্বীকৃতি মতে, এ হাদীসটি সহীহ। এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রাহ.) তাঁর ‘আস সুনান’ গ্রন্থে উল্লেখ করার পর বলেন-

حديث ثوبان حديث حسن، وقد روي هذا الحديث عن معاوية بن صالح، عن السفر بن كسير، عن يزيد بن شريح عن أبي أمامة، عن النبي صلى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَرُوي هذا الحديث عن يزيد بن شريح عن أبي هريرة عن النبي صلى الله عليه وسلم، وكان حديث يزيد بن شريح عن أبي حي المؤذنِ، عَنْ فَوْبَانَ فِي هَذَا أَجْوَدُ إِسْنَادًا وَأَشْهَرُ

হযরত সাওবান রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা থেকে বর্ণিত হাদীসটি ‘হাসান’। আর এ হাদীসটি হযরত মুয়াবিয়া বিন সালিহ (রা.)-এর সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে। সূত্রটি হল- হযরত মুয়াবিয়া বিন সালিহ হযরত সাফ বিন নুসাইর থেকে, তিনি ইয়াযিদ বিন শুরাইহ্ থেকে, তিন আবু উমামা (রা.) থেকে, তিনি রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেন। তাছাড়া এ হাদীসটি (অন্য সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে) হযরত ইয়াযিদ বিন শুরাইহ থেকেও বর্ণিত হয়েছে। তিনি হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে, তিনি রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন। তবে ইয়াযিদ বিন শুরাইহ (রাহ.) হযরত সাওবান (রা.) থেকে বর্ণনা করার সূত্রটি এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও ভাল।

আবুল হাসান উবাইদুল্লাহ্ মুবারকপুরী (রহ.) বলেন-

حديث لوبان هذا ليس بضعيف بل صحيح أو حسن كما ستعرف، فهو حجة بلا شك

‘হযরত ছাওবান থেকে বর্ণিত হাদীসটি ‘দ্বয়ীফ’ নয়; বরং সহীহ বা হাসান, যা শীঘ্রই তুমি জানবে আর এটি নিঃসন্দেহে দলীল।” হযরত আবু উমামাহ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

1. প্রাগুক্ত।

2. ইমাম তিরমিযী, ‘আস-সুনান, প্রাগুক্ত, খ.২, পৃ.১৮৯, হা.নং-৩৯৭।

3. উবাইদুল্লাহ মুবারকপুরী, মিরআতুল মাফাতীহ, (ভারত। ইদারাতুল বুহুসুল ইলমিয়্যাহ ওয়াদ দা’ওয়াহ্ ওয়াল ইফতা, ৩য় সংস্করণ, ১৪০৪হি.), খ.৩, পৃ.৫১৬।

ولا يؤمن أحدكم فيخص نفسه بالدعاء دونهم، فمن فعل فقد حالهم

‘কেউ জনসাধরণের ইমামতি করলে সে যেন মুসল্লীগণের জন্য দুআ না করে, শুধু নিজের জন্য দুআ করে চলে না যায়। যে এ রকম করে, সে মুসল্লীদের খেয়ানত করে।”

ইমাম আবু দাউদ (রহ.) “আস-সুনান”, ইমাম ইবন মাজাহ (রহ.) “আস-সুনান’, ইমাম এ হাদীসটি আরো একাধিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রহ.) “আস-সুনান উপরিউক্ত হাদীসটি বিভিন্ন সূত্রে বর্ণনা করেছেন। কোন ‘হাসান’ হাদীস অন্য সূত্রে বর্ণিত বায়হাকী (রহ.) “শুয়াবুল ঈমান”, ইমাম ইবনুল মুকুরী (রহ.) “আল-মু’জাম” বিভিন্ন সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এটি সাধারণ পরিভাষা। সুতরাং এ হাদীসটিও সহীহ। এ হাদীসে বলা হয়েছে যে, কেউ ইমামতি করলে, সে যেন শুধু নিজের জন্য দুআ করে চলে না যায়; বরং নিজের জন্য এবং মুসল্লী জন্য দুআ করবে।

ইমাম যখন দুআ করবে, শরয়ী পদ্ধতি মেনেই দুআ করবে। দুআর পদ্ধতি হল- উভয় হাত তোলে ইমাম সাহেব দুআ করবে এবং মুসল্লীগণ ‘আমীন’ বলবে। অনেকে বলে, এ হাদীস দ্বারা নামাযের ভেতরের দুআ-কে বোঝানো হয়েছে। তারা বলে, ইমাম নামাযের ভেতরের পঠিত দুআ-এ মা’ছুরার একবচনের শব্দসমূহে বহুবচনে রূপান্তর করে পড়বে। তাতে ইমামের দুআয় মুসল্লীগণও অন্তর্ভুক্ত হবে। অনেকে আবার তাদের এ কথাকে প্রত্যাখান করে বলে, দুআ-এ মা’ছুরায় এ রকম পরিবর্তন করা বৈধ নয়; বরং একবচনের শব্দ থাকলে, তা একবচনে পড়ে ব্যাপকতার নিয়ত করবে। তাদের এ যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, হাদীসে নামাযের ভেতরের দুআর প্রতি কোন ইঙ্গিত নেই; বরং নামাযের বাইরের দুআর প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। হাদীসে বলা হয়েছে যে, “নিজের জন্য দুআ করে যেন চলে না যায়”। এ কথাটি নামাযের বাইরের দুআর প্রতি তুলনামূলক বেশি ইঙ্গিত করে। তদুপরি, নামাযের পরের বা বাইরের দুআ উদ্দেশ্য হলে, দুআ-এ মা’ছুরার পরিবর্তন সম্পর্কিত যুক্তিটি উত্থাপন করার কোন সুযোগ নেই। তাছাড়া নামাযের পর হাত তোলে ব্যক্তিগতভাবে বা সম্মিলিতভাবে দুআ করার নিষেধাজ্ঞামূলক একটি হাদীসও নেই। নিষেধাজ্ঞার কোন হাদীস না থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ নামাযের পরে হাত তোলে দুআ

1. ইমাম আহমদ, আল-মুসনাদ, (বৈরুত: মুয়াচ্ছাসাতুর রিসালাহ, ১ম সংস্কও, ১৪২১হি.), খ.৩৬, পৃ.৫৮১, হা.নং-২২২৪১।

করাটা অবৈধ মনে করে।দুয়া করার ব্যাপারে অনেকগুলো হাদীস থাকার পর এটিকে অবৈধ বলার কোন সুযোগ নেই। তবে কেউ যদি নামাযের পর হাত তোলে দুআ করাটা অবৈধ মনে করে।সেটি নিতান্তই তার ব্যক্তিগত ব্যাপার; কিন্তু যারা দুআ করে, তাদেরকে বাঁধা দেওয়ার অধিকার তো তাদের নেই। সাহাবায়ে কিরাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পুঙ্খানুপঙ্খভাবে অনুসরণ করতেন। এখন দেখি তাঁদের থেকে এ বিষয়ে কোন আমল রয়েছে কিনা। বাহরাইনের ধর্মত্যাগকারীদের বিরুদ্ধে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আলা ইবনুল হাম্বরামী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-কে প্রেরণ করেন। তিনি পথিমধ্যে যাত্রা বিরতি করেন। তাঁর সাথে অনেক সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেঈগণ ছিলেন। তাঁরা বলেন-

لودي بصلاة الصبح حين طلع الفجرُ فَصَلّى بالناس، فَلَمَّا قَضَى الصَّلاةَ جَنا على ركبتيه وجنا الناس وَنَصِبَ فِي الدُّعَاءِ وَرَفَعَ يَدَيْهِ وَفَعَلَ النَّاسُ مِثْلَهُ حَتَّى طَلَعَتِ الشَّمْسُ

‘ফজরের সময় হলে ফরযের নামাযের জন্য আযান দেয়া হল। অতঃপর তিনি (হযরত আলা ইবনুল হাদ্বরামী) আমাদেরকে নিয়ে নামায আদায় করেন। নামায আদায়ের পর তিনি এবং অন্যান্য সকলেই নতজানু হয়ে বসে পড়লেন। তিনি হাত তোলে দুআ করলেন এবং অন্যান্য সকলেই তাঁর অনুরূপ করলেন। দুআ করতে করতে সূর্য উদিত হয়ে গেল। “১
এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হল যে, সাহাবায়ে কিরামও সম্মিলিতভাবে হাত তোলে দুআ করতেন।

লা-মাযহাবীদের প্রখ্যাত সৌদি আলেম ইবন বায বলেন-

فالحاصل أن الدعاء في دبر الصلاة أمر مشروع وأفضله ما كان قبل السلام، وإن دعا بعد السلام وبعد الذكر بينه وبين نفسه فلا بأس، قد ما يدل على شريعة الدعاء أيضاً بعد السلام

1. ক. ইবন কসীর, আল-বিদাইয়া ওয়ান নিহাইয়া, (বৈরুত: দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরবী, ১ম সংস্করণ, ১৪০৮হি.), খ.৬, পৃ.৩৬১; তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়ার রুসুল ওয়াল মুলুক, (বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়‍্যাহ), খ.২, পৃ.২৮৮।

মূল কথা হলো নামাজের পর দোয়া করা শরীয়তসম্মত বিষয়।সালামের পর ও জিকির-আযকার পাঠের পর দুআ করা হয়, তাতে কোন অসুবিধে নেই। আর সালামের পর দু’আ করা শরীয়ত সম্মত হওয়ার ব্যাপারটিও প্রমাণ রয়েছে। “১

শেষ বৈঠকে দরূদ শরীফ পাঠ করার পর বিবিধ দুআ-এ মা’ছুরা পাঠ করা সালামের পূর্বে ও পরে দুআ করা শরীয়ত সম্মত। নামাযের ভেতরে সালামের পূর্বে দুআ করা হয়। এ বিষয়ে কোন মতানৈক্য নেই। তবে সালামের পর দুআ করা বৈধ হওয়ায় আমরা এর প্রতি উৎসাহিত করি।

লা-মাযহাবীদের প্রখ্যাত আলেম আব্দুর রহমান মুবারকপুরী তিরমিযী শরীফের ভাষ্যগ্রন্থ ‘তুহফাতুল আহওয়াযী’ গ্রন্থে এ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। উভয় পক্ষের কথা পর্যালোচনা করে নিজের মত পেশ করে বলেন-

قُلْتُ الْقَوْلُ الرَّاجِحُ عِنْدِي أَنْ رَفَعَ الْيَدَيْنِ فِي الدُّعَاءِ بَعْدَ الصَّلَاةِ جَائِرٌ لَوْ فَعَلَهُ أَحَدٌ لَا بَأْسَ عَلَيْهِ إِنْ شَاءَ اللهُ تَعَالَى

আমি বলছি, আমার কাছে গ্রহণযোগ্য অভিমত হল, নামাযের পর উভয় হাত তোলে দুআ করাটা বৈধ। যদি কেউ এভাবে দুআ করে, তাহলে কোন অসুবিধে নেই ইনশা আল্লাহ।”

সংক্ষিপ্ত ও দীর্ঘ মুনাজাত

ফরয নামাযের পর সম্মিলিত মুনাজাত করা বৈধ। দুআ বা মুনাজাত সংক্ষিপ্ত বা দীর্ঘ করা যায়। তবে দু’টিরই বিশেষ ক্ষেত্র রয়েছে। যে সব ফরয নামাযের পর সুন্নাতে মুআক্কাদাহ্ রয়েছে, সে সব নামাযের পর মুনাজাত সংক্ষিত করা প্রয়োজন। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বলেন,

كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا سَلَّمَ لَمْ يَقْعُدْ إِلَّا مِقْدَارَ مَا يَقُولُ: اللَّهُمَّ أَلتَ السَّلَامُ وَمِنكَ السَّلَامُ، تَبَارَكْتَ ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ

1.https://binbaz.org.sa/fatwas/18794/

2. আব্দুর রহমান মুবারকপুরী, প্রাগুক্ত, খ.২, পৃ.১৭৩।

‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (ফরজ নামাজের পর) শুধু ‘আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম ওয়া মিনকাস সালাম তাবারাকতা ইয়া যালজালালি ওয়াল ইকরাম’ দুআটি পড়ার সময় পরিমাণ (নামাযের স্থানে) অবস্থান করতেন।”

হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা থেকে অন্য সূত্রে বর্ণিত রয়েছে, তিনি

ما كان التي على الله عليه وسلم يجلس بعد صلابه إلا قدر ما يقول اللهم أنت السلام، ومن

السلام تباركت يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (ফরজ নামাজের পর) শুধু ‘আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম ওয়া মিনকাস সালাম তাবারাকতা ইয়া যালজালালি ওয়াল ইকরাম’ দুআটি পড়ার সময় পরিমাণ (নামাযের স্থানে) অবস্থান করতেন।২
হাদীস শরীফটি একাধিক সূত্রে সুনানুত তিরমিযী’, ‘সুনানু ইবনে মাজাহ’, ‘সুনানু আবী দাউদ’, ‘সহীহু ইবনে হিব্বান, সুনানু নাসাঈ’ ‘সুনানুদ দারামী’, ‘মু’জামুল আওসাত্ব’সহ বহু কিতাবে বর্ণিত রয়েছে। উপরিউক্ত হাদীস শরীফ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরয নামাযের পর “আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম ওয়া মিনকাস সালাম ভাবারাকতা ইয়া যালজালালি ওয়াল ইকরাম” দুআটি পড়ার সময় পরিমাণ নামাযের স্থানে অবস্থান করতেন কখনো তিনি দুআটি পড়তেন আবার কখনো এর সমপরিমাণ অন্য দুআ পড়তেন। এ হাদীসে দুআ সংক্ষিপ্ত করার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। কতিপয় হাদীসে ফরয নামাযের পর বিবিধ দীর্ঘ দুআ-এ মাছুরা পাঠ করার উল্লেখ রয়েছে। ফুকাহায়ে কিরাম ও মুহাদিসীনে ইজাম (রাহ.) উভয় হাদীসের মধ্যে সমন্বয় করে বলেন, যেসব ফরয নামাযের এর সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ রয়েছে, যেসব নামাযের পর মুনাজাত দীর্ঘ করা যাবে না; বরং দীর্ঘ করা মাকরূহ। কারণ দীর্ঘ মুনাজাতের কারণে সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ্ আদায়ে বিলম্ব হয়।

1. ইমাম মুসলিম, আস সহীহ, (বৈরুত: দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরবী), খ.১ম, পৃ.৪১৪, হা.নং-১৩৬।

২. ইমাম আহমদ, আল-মুসনাদ, (বৈরুত: মুয়াস্সাসাতুর রিসালাহ্, ১ম সংস্করণ, ১৪২১হি.), খ.৪৩, পৃ.১২৪, হা.নং-২৫৯৭৯।

৩. ইবন আবেদীন শামী, রাদ্দুল মুহতার, (বৈরুত: দারুল ফিকর, ২য় সংস্করণ, ১৪১২হি.), খ. ১ ও ৬, ৭.৫৩০ ও ৪২৩; ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া, (বৈরুত: দারুল

রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ বিলম্বে আদায় করতেন না, যা উপরিউক্ত হাদীস শরীফম্বয় থেকে প্রমাণিত। এ রকম বিলম্ব করাটা ‘সুন্নাতে মুয়াজাবাহ’ বা রাসূলের স্থায়ী সুন্নাতের পরিপন্থী। আর যেসব ফরয নামাযের পর সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ নেই, সেসব নামাযের পর দীর্ঘ মুনাজাত করতে কোন অসুবিধে নেই।। হাদীসে বর্ণিত দীর্ঘ যিকার-আযকার ও দুআ পাঠের হাদীসগুলো এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

শহরের অধিকাংশ মসজিদে জুমুআর নামাযে মসজিদে স্থান না পেয়ে মুসল্লীগণ মসজিদের বাইরে নামায আদায় করে। এ সকল মুসল্লীগণের ব্যাপারে গ্রীষ্মকালের প্রখর রোদ আর বর্ষাকালের দুর্যোগ আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে ইমামের মুনাজাত করা উচিত। তাছাড়া অসুস্থ, দুর্বল এবং অভাবীদের অবস্থার দিকে খেয়াল রাখাও ইমামদের উচিত। কারণ এ সকল মুসল্লীদের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রেখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানে নামায সংক্ষিপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানে মুনাজাতের মত মুস্তাহাব আমলকে দীর্ঘায়িত করার হুকুম কী হবে, তা সহজেয় অনুমেয়। হযরত আবু মাসউদ আনসারী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি রাসুলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি শপথ করে বলছি যে, আমি ফজরের নামায বিলম্ব করে পড়ি। তাঁর জামাতে নামায না পড়ার কারণ হল, ইমাম সাহেব নামায দীর্ঘায়িত করেন। হযরত আবু মাসউদ (রা.) বলেন, এতবেশি রাগান্বিত হয়ে নির্দেশ দিতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি আর কোন দিন দেখি নি। অতঃপর রাসুলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

إِنَّ مِنْكُمْ مُتَفْرِينَ، فَأَيُّكُمْ مَا صَلَّى بِالنَّاسِ فَلْيَتَجَوِّزْ، فَإِنَّ فِيهِمُ الضَّعِيفَ وَالكَبِيرَ وَذَا الْحَاجَةِ

‘তোমাদের মধ্যে এমন ব্যক্তি রয়েছে, যারা অন্যকে নামাযের প্রতি নিরুৎসাহিত করে। (অর্থাৎ নামায দীর্ঘ করার কারণে অনেকে জমাতে অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত হয়) তোমাদের মধ্যে যারাই ইমামতি করবে, তারা যেন নামায (কিরাত দীর্ঘায়িত না করে) সংক্ষিপ্ত করে। কেননা, মুসল্লীদের মধ্যে দুর্বল, বৃদ্ধ এবং অভাবী ব্যক্তি থাকে।” উপরিউক্ত হাদীস থেকে বোঝা গেল যে, মুসল্লীদের অবস্থার প্রতি ইমামদের লক্ষ্য রাখা উচিত। অনেক মসজিদে দেখা যায় যে, ইমাম সাহেব বিশেষকরে জুমুআর ফরয নামায আদায়ের পর দীর্ঘ মুনাজাত

ফিকর, ২য় সংস্করণ, ১৩১০হি.), খ.৫, পৃ.৩১৭।

করেন। একই প্রার্থনা কখনো আরবী আর কখনো উর্দু কিংবা বাংলায় করে থাকেন। ইমাম সাহেবের কণ্ঠ সুমিষ্ট হলে তো কথা নেই। যেন না’তের আসরে বসে শ্রোতাদের মনোরঞ্জনে মেতে উঠেন। অনেকে এ সময় ‘বাদাল জুমা’ ও নফল নামায পড়তে থাকে। তাদের আভিজ্ঞতা আছে যে, সুন্নাত পড়ার পরও মুনাজাত শেষ হবে না। দুর্বল, অসুস্থ এবং অভাবী ব্যক্তিদের অবস্থার প্রতি যেমন লক্ষ্য রাখা উচিত, তেমনিভাবে প্রখর রোদে কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে মসজিদের বাইরে অবস্থানরত মুসল্লীদের অবস্থার প্রতিও লক্ষ্য রাখা ইমামদের উচিত। যতক্ষণ পর্যন্ত মুসল্লী খুশু খুদু (একনিষ্ঠতা) নিয়ে মুনাজাত করবে ততক্ষণ ইমাম মুসল্লীদের নিয়ে মুনাজাত করতে অসুবিধা নেই।

উপসংহার: শতাধিক হাদীস শরীফে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম

সাধারণভাবে হাত তোলে দুআ করতেন। সহীহ হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহরের ফরয নামাযের পর হাত তোলে দুআ করতেন। আরো প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি নামাযের পর এবং অন্যান্য সময়ও সাহাবায়ে কিরামকে নিয়ে সম্মিলিতভাবে দুআ করতেন। সাহাবায়ে কিরামও সম্মিলিতভাবে হাত তোলে দুআ করতেন। অপরপক্ষে নামাযের পর হাত তোলে দোয়া করা অবৈধ হওয়ার পক্ষে কোন সহীহ হাদীস তো দূরের কথা, কোন ‘যয়ীফ’ হাদীসও নেই। উল্লেখ্য, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘দুআই ইবাদতের মগজ।’ যেটি বৈধ হওয়ার ব্যাপারে অসংখ্য হাদীস রয়েছে এবং যেটি ইবাদতের মগজ, সেটি গ্রহণ করবেন; নাকি যেটি অবৈধ হওয়ার ব্যাপারে কোন যয়ীফ হাদীস পর্যন্ত নেই সেটি গ্রহণ করবেন? কোনটা গ্রহণ করবেন, সেটা আপনাদের ব্যাপার। তবে যাঁরা এটিকে বৈধ মনে করেন এবং আমল করেন, তাঁদেরকে বাঁধা দেওয়া, সৎকাজে বাঁধা দেওয়ার শামিল। আল্লাহ তআলা আমাদেরকে সুন্নাহ মোতাবেক নিজের জীবন গঠন করার তাউফিক দান করুন। আমিন!