নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর প্রতি আদব, মুহব্বত, ভালোবাসা এবং তাঁর সত্তাকে ঘিরে শব্দচয়ন।

সৈয়দ মোহাম্মদ শরফুদ্দীন সম্রাট (মাঃজিঃআঃ)

ভূমিকাঃ নবী করিম (সাঃ) ইসলামের পূর্ণতা ও সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি। আল্লাহ তাআলা তাঁকে রহমাতুল্লিল আলামিন হিসেবে পাঠিয়েছেন। তাঁর প্রতি আদব, মুহব্বত ও ভালোবাসা কেবল একটি আবেগিক চর্চা নয় বরং এটি ঈমানের অংশ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধাবোধ, কথাবার্তায় নম্রতা, এবং শব্দচয়নে পরিশুদ্ধতা একজন মুসলমানের অন্তরগত ঈমান ও নৈতিকতার পরিপূর্ণতার পরিচায়ক।

১. আদবের ভিত্তি কেমন হবে! এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআন মজীদে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَرۡفَعُوۡۤا اَصۡوَاتَکُمۡ فَوۡقَ صَوۡتِ النَّبِیِّ وَ لَا تَجۡہَرُوۡا لَہٗ بِالۡقَوۡلِ کَجَہۡرِ بَعۡضِکُمۡ لِبَعۡضٍ اَنۡ تَحۡبَطَ اَعۡمَالُکُمۡ وَ اَنۡتُمۡ لَا تَشۡعُرُوۡنَ ﴿۲﴾

হে মু’মিনগণ! তোমরা নবীর কন্ঠস্বরের উপর নিজেদের কন্ঠস্বর উচু করনা এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চৈঃস্বরে কথা বল তার সাথে সেই রূপ উচ্চৈঃস্বরে কথা বলনা; কারণ এতে তোমাদের কাজ নিস্ফল হয়ে যাবে তোমাদের অজ্ঞাতসারে।
O you who believe! Raise not your voices above the voice of the Prophet (SAW), nor speak aloud to him in talk as you speak aloud to one another, lest your deeds may be rendered fruitless while you perceive not.
> ” (সূরা হুজরাত: ২)

 

এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা আমাদের শিখিয়েছেন যে, রাসূল (সাঃ) এর সামনে যেমন আদব জরুরি, তেমনি তাঁর নাম নেয়ার ক্ষেত্রেও আদব অপরিহার্য। ইমাম মালিক (রহ.) মসজিদে নববীতে উচ্চস্বরে ফতোয়া দিতে সংকোচ করতেন, কারণ তিনি বলতেন, “এ জায়গায় রাসূল (সাঃ) বিশ্রাম নিচ্ছেন, আমি কিভাবে কণ্ঠস্বর উঁচু করি?”

২. মুহব্বতের প্রকৃত রূপ রাসূল (সাঃ) কে ভালোবাসা ঈমানের শর্ত। হাদীসে এসেছে:
عن أنس بن مالكٍ رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: ((لا يؤمن أحدكم حتى أكون أحبَّ إليه من ولده ووالده والناس أجمعين)). رواه البخاري۔ حكم الحديث الصحيح۔
التخريج : أخرجه أحمد (12814)، والدارمي (2783)، وأبو يعلى (3049) واللفظ لهم.

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বর্ণনা করেন,“তিনি বলেন-নবী করিম (সাঃ) ইরশাদ করেন,

> “তোমাদের কেউ পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি এবং সকল মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় না হই।” (বুখারী)

ইমাম বুখারী(র) হাদিসটি বর্ননা করেছেন। হাদিসের মান:সহিহ।

এটি আরও রয়েছে-
★মুসনাদে আহমদ -হাদিস নং-১২৮১৪.
★দারামী শরীফ-হাদিস নং-২৭৮৩.
★মুসনাদে আবু ইয়ালি-হাদিস নং-৩০৪৯

এই মুহব্বত শুধুমাত্র মুখের কথা নয়, বরং তা প্রকাশ পায় তাঁর সুন্নাহর অনুসরণে, তাঁর জীবনাদর্শকে ধারণে এবং তাঁর সম্মানে আমাদের প্রতিটি অভিব্যক্তিতে।

৩. শব্দচয়নের আদবঃ নবী করিম (সাঃ) এর কথা বলার সময় অথবা তাঁর জীবনের কোনো ঘটনা বর্ণনা করার সময় শব্দের প্রতি সংবেদনশীলতা অপরিহার্য। কিছু মৌলিক নির্দেশনা:
আল্লাহ পাক আমাদের এই বিষয় এ বার বার সতর্ক করেন-
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَقُوۡلُوۡا رَاعِنَا وَ قُوۡلُوا انۡظُرۡنَا وَ اسۡمَعُوۡا ؕ وَ لِلۡکٰفِرِیۡنَ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ﴿۱۰۴﴾

হে মু’মিনগণ! তোমরা ‘রা‘য়েনা’ বলোনা, বরং ‘উনযুরনা’ (হে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার প্রতি নজর করুন,দৃষ্টি দান করুন) বলো এবং শুনে নাও – অবিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে যন্ত্রনাময় শাস্তি।(সূরা-আল-বাকারা -১০৪)

তাঁর নামের সঙ্গে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলা ফরজ না হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মুস্তাহাব।

★শব্দ নির্বাচনে যেন হালকা, সাধারণ, হাস্যরসাত্মক বা অবজ্ঞাসূচক কিছু না আসে।

কোনো আলোচনা বা প্রেক্ষাপটেও এমন ভঙ্গি ও শব্দ ব্যবহার করা চলবে না যা ওনার প্রতি সম্মানহানির আশঙ্কা তৈরি করে।

৪. অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় আদবঃ বর্তমানে বিভিন্ন পোস্ট, ভিডিও, ক্যাপশন বা মন্তব্যে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নাম ব্যবহার করার সময় অনেকেই অবচেতনভাবে আদব লঙ্ঘন করে বসেন। কিছু মূল নীতি:

তাঁর নাম লিখলে সাথে সাথে “(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)” বা “ﷺ” লেখা উচিত।

হাস্যরস বা জোকসের মধ্যে নবীর নাম না আনা।

তাঁর জীবন, সিরাত বা হাদীস থেকে কিছু পোস্ট করলে সেটি বিশুদ্ধ ও সম্মানজনক উৎস থেকে নেয়া নিশ্চিত করা।

৫. কবিতা এবং নাতে রাসূল (সাঃ) এর ভাষাশৈলীঃ নাতে রাসূল (সাঃ) লিখতে বা বলতে গিয়ে যেন ভালোবাসা ও ভক্তির পরাকাষ্ঠা প্রকাশ পায়,
ইমাম বুসুরী(র) কি মধুর এবং অন্তরের অন্তস্থল হতে নবীজি(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)এর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রদর্শন করেছেন❤️
যেমন:

কাসিদা-ই-বুরদা (চাদরের কবিতা) হলো ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর প্রশংসায় আরবীতে রচিত সুদীর্ঘ কবিতা।[১] এটি রচনা করেন সুফি সাধক শরফুদ্দিন আল-বুসিরি কর্তৃক রচিত হয়।[২]
এটির প্রকৃত নাম হলো ”আল কাওয়াকিবুদ দুররিয়াহ ফি মাদহি খায়রিল বারিয়াহ” (الكواكب الدرية في مدح خير البرية; “সৃষ্টির সেরার প্রশংসায় উজ্জ্বল নক্ষত্রমালা”)।

কাসিদা-ই-বুরদা

مولاي صلي وسلم دائماً ابداً
মাওলা ইয়া সাল্লি ওয়া সাল্লিম দাইমান আবাদান
ও মোর মওলা চিরকাল সালাত ও সালাম পাঠাও

على حبيبك خير الخلق كلهمِ
আলা হাবীবিকা খাইরিল খালকি কুল্লিহিমি
তোমার হাবিব যিনি সৃষ্টির সেরা তার উপরে

محمد سيدُ الكونين والثقلين
মুহাম্মাদুন সাইয়িদুল কাওনাইনি ওয়াছ-ছাক্বালাইনি
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিনি দুজাহানের ও দুগোষ্ঠীর (ইনসান ও জ্বিন) সর্দার।

والفريقين من عُربٍ ومن عجمي
ওয়াল-ফারীক্বাইনি মিন উরবিওঁ ওয়া মিন আজামী
এবং আরবদের ও আজমদের মাঝেও।

 

৬. শব্দে শব্দে মুহব্বতের প্রতিফলনঃ
আমরা যখন বলি “আমার প্রাণের নবী”, “নূরে মুজাসসাম”, “তাজদারে মদিনা”, “সাইয়্যিদুল মুরসালীন” – এসব শব্দ শুধু অলংকার নয়, এগুলো হচ্ছে ভক্তির নিখাদ প্রকাশ। আমাদের শব্দে যেন সেই অনুরাগ ও শ্রদ্ধা প্রতিফলিত হয়।
এই নীতিমালা আল্লাহ পাক নিজেই শিখিয়ে দিয়েছেন-

قُلۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ تُحِبُّوۡنَ اللّٰہَ فَاتَّبِعُوۡنِیۡ یُحۡبِبۡکُمُ اللّٰہُ وَ یَغۡفِرۡ لَکُمۡ ذُنُوۡبَکُمۡ ؕ وَ اللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ﴿۳۱﴾

হে রাসূল ﷺ!
আপনি বলুন!যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাসো তাহলে আমার (অর্থাৎ আমি নবী মুহাম্মদ ﷺ এর)অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসেন ও তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করেন; এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়।(সূরা আল-ইমরান-৩১)

৭. নবীর সমালোচনা নয়, অনুসরণই ঈমান।
★ মুসলমানের মধ্যে বর্তমানে কেউ কেউ ইতিহাস বা হাদীসের পেছনে গবেষণার নামে রাসূল (সাঃ)-এর জীবন নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আমরা এসব বিষয়ে আলোচনা করলেও, তাঁর প্রতি ঈমান ও শ্রদ্ধাবোধ কখনো ক্ষুন্ন হওয়া চলবে না। তাঁর জীবনের প্রতিটি দিক আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। কাজেই আমাদের অবস্থান হবে অনুসরণ, না যৌক্তিকতা খোঁজার অজুহাতে আদবের সীমা লঙ্ঘন।

এই প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক আমাদের কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেছেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تُقَدِّمُوۡا بَیۡنَ یَدَیِ اللّٰہِ وَ رَسُوۡلِہٖ وَ اتَّقُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ ﴿۱﴾

হে মু’মিনগণ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে তোমরা কোন বিষয়ে অগ্রনী হয়োনা এবং আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।(সূরা -হজুরাত-১)

৮. সাহাবায়ে কেরামদের আদবের নমুনাঃ

হযরত আবু বকর (রা.) কখনো তাঁর সামনে উচ্চস্বরে কথা বলতেন না।

হযরত ওমর (রা.) কেউ রাসূল (সাঃ) এর বিরুদ্ধে সামান্য কিছু বললেই কঠোর রূপ ধারণ করতেন।

হযরত আনাস (রা.) বলেন, “আমি ১০ বছর তাঁর খিদমতে ছিলাম, একবারও তিনি ‘উহ্’ বলেননি।”

তাঁদের আদব ছিল ঈমানের নিদর্শন, আর আমরা তো তাদের উত্তরসূরি।

৯.নবী করিম (সাঃ) এর প্রতি সাহাবায়ে কেরামের মুহব্বত ও আদবের বাস্তব উদাহরণঃ

১ম হাদীস

أصل الحديث (আরবি):

عَنْ أَبِي مُوسَى رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، قَالَ: كنت عِنْدَ النَّبِيِّ ﷺ وَهُوَ نَازِلٌ بِالْجِعِرانَةِ بَيْن مَكَّةَ وَالْمَدِينَةِ، وَمَعَهُ بِلَالٌ، فَأَتَى النبي أَعْرَابِيٌّ، فَقَالَ: أَلَا تُنْجِز لِي مَا وَعَدْتَنِي؟ فَقَالَ لَهُ: أَبْشِرْ، فَقَالَ: قَدْ أَكْثَرْتَ عَلَيَّ مِنْ أَبْشِرْ، فَأَقْبَلَ عَلَى أَبِي مُوسَى وَبِلَالٍ كَهَيْئَةِ الْغَضْبَانِ، فَقَالَ: ردَّ الْبُشْرَى، فَأَقْبلا أنتما، قَالَ: قبلنا ۔ ثُمَّ دَعَا بِقَدَحٍ فِيهِ مَاءٌ، فَغَسَلَ يَدَيْهِ وَوَجْهَهُ فِيهِ، وَمَجَّ فِيهِ، ثُمَّ قَالَ : اشْرَبَا مِنْهُ، وَأَفْرِغَا عَلَى وُجوهِكُمَا وَنُحُورِكُمَا وأبشرا!

فَأَخَذَا الْقَدَحَ فَفَعَلَا، فَنادت أُمُّ سَلَمَةَ مِنْ وَرَاءِ السِّتْرِ: أَنْ أفضلا لِأُمِّكُمَا؟ فَأَفْضَلَا لَهَا مِنْهُ طَائِفَةً.

مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ۔( أخرجه البخاري في الصحيح۔ كتاب المغازي ۔جلد-٤، رقم-٤٠٧٣) ( ومسلم في الصحيح،كتاب فضائل الصحابة،جلد-٤، رقم-٢٤٩٧)

বাংলা অনুবাদ:

হযরত আবু মূসা আশ’আরী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: আমি নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে ছিলাম, যখন তিনি মক্কা ও মদিনার মাঝামাঝি ‘জুরআনা’ নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন। তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন হযরত বেলাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। এমন সময় একজন আরবি লোক এসে বলল, “হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা দিবেন না?” তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “সুসংবাদ গ্রহণ করো।” সে বলল, “আপনি আমাকে সুসংবাদ তো অনেক দিয়েছেন, কিন্তু দিন কিছু!”

এতে নবীজি কিছুটা অপ্রসন্ন হয়ে হযরত আবু মূসা ও বেলালের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সে তো জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করলো না,তোমরা কি তা গ্রহণ করবে?” তখন তাঁরা বললেন, “আমরা গ্রহণ করলাম।” এরপর নবী করিম (সাঃ) এক পাত্রে পানি আনালেন, তাতে তিনি নিজের হাত ও মুখ ধুয়ে কুলি করলেন, এবং বললেন, “এটা থেকে তোমরা পান করো এবং নিজেদের মুখমণ্ডল ও বুকে মাখিয়ে নাও।” তখন তাঁরা তা গ্রহণ করলেন এবং তার দ্বারা মুখ ও বুক বা সিনা ধৌত করলেন।

এতে পর্দার অন্তরাল থেকে উম্মে সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বললেন, “আমার মায়ের জন্য অবশ্যই এই তবারুকের পানি রেখে দিবেন।” তখন তাঁরা তা থেকে অল্প কিছু বরকত এবং তবারুকের পানি উম্মে সালামা (রাঃ) এর মায়ের জন্য রেখে দিলেন।(সুবহানাল্লাহ)

★ইমাম বুখারী,ইমাম মুসলিম (রহ:) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।এটি রয়েছে সহীহ বুখারীর কিতাবুল মাগাজীর ৪র্থ খন্ডের ৪০৭৩ নাম্বার হাদীসে এবং সহীহ মুসলিম শরীফে কিতাবু ফাজাইলিস সাহাবা (সাহাবীদের ফজিলত সংক্রান্ত অধ্যায়ে) ৪র্থ খন্ডে,হাদীস নং-২৪৯৭ এ।

২য় হাদীস

أصل الحديث (আরবি):

عَنْ الْمِسْوَرِ بْنِ مَخْرَمَةَ وَمَرْوَانَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا، قَالَا: إِنَّ عُرْوَةَ جَعَلَ يرمق أصحاب النَّبِيَّ ﷺ بعينيه، قال : فوالله ! ما تنخم رسول اللهﷺ نخامة الا وقعت في كف رجل منهم
فَدَلَكَ بِهَا وَجْهَهُ وَجِلْدَهُ، وَإِذَا أَمَرَهُمْ ابْتَدَرُوا أَمْرَهُ، وَإِذَا تَوَضَّأَ كَادُوا يَقْتَتِلُونَ عَلَى وَضُوْئِهِ، وَإِذَا تَكَلَّمَ خَفَضُوا أَصْوَاتَهُمْ عِنْدَهُ، وَمَا يُحِدُّوْنَ إِلَيْهِ النَّظَرَ تَعْظِيْمًا لَهُ.

فَرَجَعَ عُرْوَةُ إِلَى أَصْحَابِهِ، فَقَالَ: أي قَوْمِ! ، وَاللَّهِ، لَقَدْ وَفَدْتُ عَلَى الْمُلُوْكِ، وَوَفَدْتُ عَلَى قَيْصَرَ وَكِسْرَى وَالنَّجَاشِيِّ، وَاللَّهِ، إِنْ رَأَيْتُ مَلِكًا قَطُّ يُعَظِّمُهُ أَصْحَابُهُ مَا يُعَظِّمُ أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ ﷺ مُحَمَّدًا، وَاللَّهِ، إِنْ تَنَخَّمَ نُخَامَةً إِلَّا وَقَعَتْ فِي كَفِّ رَجُلٍ مِنْهُمْ، فَدَلَكَ بِهَا وَجْهَهُ وَجِلْدَهُ، وَإِذَا أَمَرَهُمْ ابْتَدَرُوا أَمْرَهُ، وَإِذَا تَوَضَّأَ كَادُوا يَقْتَتِلُونَ عَلَى وَضُوْئِهِ، وَإِذَا تَكَلَّمَ خَفَضُوا أَصْوَاتَهُمْ عِنْدَهُ، وَمَا يُحِدُّوْنَ إِلَيْهِ النَّظَرَ تَعْظِيْمًا لَهُ…… الحديث۔

رواه البخاري وأحمد وابن حبان۔

( أخرجه البخاري في الصحيح،كتاب الشروط،جلد-٢،رقم-٢٥٨١) ،( وأحمد بن حنبل في المسند،جلد-٤،( وابن حبان في الصحيح،رقم-٤٨٧٢) ۔

বাংলা অনুবাদ:

হযরত মিসওয়ার ইবনে মাখরামা এবং মারওয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, উরওয়া ইবনে মাসউদ (রাঃ) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পূর্বে হুদায়বিয়ার সন্ধিকে কেন্দ্র করে কাফেরদের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হিসেবে নবী করিম (সাঃ)-এর সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ব্যাপারে নবী করিম (সাঃ) এর দরবারে উপস্থিত হলেন।নবী করিম (সাঃ) এর দরবারে উপস্থিত হওয়ার পর সাহাবায়ে একরামের নবী করিম (সাঃ) এর প্রতি অসম্ভব আদব তিনি নিজ চোখে পর্যবেক্ষণ করলেন।
এবং তিনি আল্লাহর নামে শপথ করে বললেন,যখনই নবী করিম (সাঃ) কোনো থুথু মোবারক নিক্ষেপ করতেন সাহাবায়ে একরামের কেউ না কেউ ওই থুথু মোবারক নিজেদের হাতে নিয়ে নিতেন এবং উনারা এটি উনাদের চেহারা এবং শরীরে মেখে নিতেন।যখন তিনি কোনো কাজের আদেশ দিতেন তখন ঐ নির্দেশ পালন করার জন্য একে অপরের উপর প্রতিযোগিতা করতেন।যখন তিনি অজু করতেন ঐ অজুর অবশিষ্ট অংশ পানি তবারুক হিসেবে নেওয়ার জন্য একে অপরের উপর প্রতিযোগিতা করতেন।যখন তিনি কথা বলতেন সাহাবায়ে কিরামগণ নিজেদের কন্ঠস্বর অনেক ছোট রাখতেন এবং নবী করিম (সাঃ) এর সম্মানে উনারা উনার চোখ মোবারকের দিকে দৃষ্টিভরে তাকাতেন না।
অতঃপর এগুলো দেখার পর হযরত উরওয়া (রাঃ) উনি উনার সম্প্রদায়ের নিকট গেলেন।তিনি বললেন,“হে আমার সম্প্রদায়!আল্লাহর কসম!আমি প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীর বড় বড় রাজা-বাদশাহের দরবারে গিয়েছি।আমি বাদশাহ কায়সার,বাদশাহ কিসরা ও নাজ্জাশীর দরবারে গিয়েছি।কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি এমন কোনো বাদশাহ আমার চোখে দেখিনি যাদের অনুসারীরা তাদের প্রতি এত সম্মান ইজ্জত করেন,যেভাবে নবী করিম (সাঃ) এর সাহাবীগণ নবী করিম (সাঃ) এর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রদর্শন করেছেন!
আমি দেখলাম যখন উনি কোনো কফ মোবারক,থুথু মোবারক নিক্ষেপ করতেন সাহাবীরা তা খেয়ে নিতেন এবং নিজেদের চেহারা এবং শরীরে মাখিয়ে নিতেন।যখন তিনি কোনো কাজের আদেশ দিতেন উনারা সাথে সাথে তা পালন করতেন।যখন তিনি অজু করতেন অজুর অবশিষ্ট পানি তবারুক হিসেবে সাহাবীগণ নিয়ে নিতেন।যখন তিনি আওয়াজ করতেন উনার আওয়াজ বরাবর কেউ আওয়াজ করতো না সাহাবীগণ আদবের সহিত নিজেদের কন্ঠস্বরকে এত নিচু রাখতেন।উনার চেহারা মোবারকের দিকে দৃষ্টিভরে চোখে চোখ রেখে সাহাবায়ে কিরামগণ তাকাতেন না উনার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার কারণে।”

এই হাদীসটি ইমাম বুখারী,ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বাল এবং ইমাম ইবনে হিব্বান বর্ণনা করেছেন।

এটি সহীহ বুখারী শরীফের ২য় খন্ডে রয়েছে। হাদীস নাম্বার ২৫৮১।

মসনদে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বালের ৪র্থ খন্ডে এবং সহীহ ইবনুল হিব্বানের এটি ৪৮৭২ নাম্বার হাদীস।

উপসংহারঃ নবী করিম (সাঃ) আমাদের ঈমানের প্রাণ, ইসলামের মুখচ্ছবি। তাঁর প্রতি মুহব্বত, আদব ও ভালোবাসা শুধু আবেগ নয় — এটি দ্বীনের প্রাণ। আমরা যদি তাঁর নাম উচ্চারণেও সংযত হই, শব্দে শব্দে সম্মান প্রকাশ করি, আমাদের প্রতিটি পোস্ট, মন্তব্য, বক্তব্যে যদি তাঁর মর্যাদা রক্ষা করি — তবেই আমরা সত্যিকার মুহিব, সত্যিকার উম্মত।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর প্রতি আদব, মুহব্বত ও ভালোবাসা হলো এমন এক শুদ্ধ আত্মিক চর্চা, যা মানুষকে নাজাতের পথে নিয়ে যায়। আল্লাহ যেন আমাদের সকলকে তাঁর প্রিয় হাবীব (সাঃ) এর প্রতি সত্যিকারের মুহব্বত ও আদবের সঙ্গে চলার তাওফিক দান করেন। আমিন।